
গোয়াইনঘাট (সিলেট) প্রতিনিধি
একসময় প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে আসতেন। মাসে হতো ২৫ থেকে ৩০টি প্রসব। রুস্তমপুর ইউনিয়নের শত শত মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল ছিল সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। কিন্তু সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রই এখন দুই বছর ধরে কার্যত পরিত্যক্ত। চিকিৎসক নেই, নেই প্রয়োজনীয় জনবল ও ওষুধপত্র। অরক্ষিত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি এখন মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যে চুরি হয়ে গেছে চেয়ার-টেবিল, ফ্যান, ফ্রিজ, আইপিএসসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির পাশেই রয়েছে রুস্তমপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়,পাবলিক লাইব্রেরী,তোয়াকুল ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও ইউপি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনার পাশে একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও ক্ষোভ।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাইরে থেকে নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন ভবনটি দেখে ভেতরের পরিস্থিতি বোঝার উপায় নেই। খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই বিভিন্ন কক্ষে মাদক সেবনের আলামত চোখে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের কিংবা রাতের যেকোনো সময় এখানে ইয়াবা, মদসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবনের আড্ডা বসে। দীর্ঘদিন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কেন্দ্রটি এখন কার্যত জনশূন্য ও অরক্ষিত। ফলে একদিকে সরকারি সম্পদ নষ্ট ও চুরি হচ্ছে, অন্যদিকে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ইউনিয়নের শত শত দরিদ্র মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে দীর্ঘদিন ধরে কোনো চিকিৎসক নেই। কিছুদিন এফআইভিডিবির ‘মমতা’ প্রকল্পের মাধ্যমে মিডওয়াইফ দিয়ে কার্যক্রম চললেও বর্তমানে সেই কার্যক্রমও বন্ধ। বর্তমানে একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা সপ্তাহে একদিন সেখানে গিয়ে সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা শাহীদা পারভীন বলেন, চেয়ার-টেবিল, ফ্যান, ফ্রিজ কিছুই নেই। এসব বিষয়ে লিখিত অভিযোগও রয়েছে। সপ্তাহে একদিন অতিরিক্ত দায়িত্বে সেখানে গিয়ে সেবা দিতে হয়। একা থাকায় নিজেরও ভয় লাগে।”
রুস্তমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহাব উদ্দিন শিহাব বলেন, দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্যে তিনিও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাঁর পাবলিক লাইব্রেরির ঘরের ওপরের টিন খুলে দুটি সিলিং ফ্যানসহ প্রয়োজনীয় কিছু বই চুরি করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের সামনে থাকা টিউবওয়েলের মাথাও চুরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “মাদকসেবীদের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়েছে যে আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি জানিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।” স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বিষয়টি উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. বদরুল ইসলামকে অবহিত করেছেন বলেও জানান তিনি।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. বদরুল ইসলাম বলেন, শুধু রুস্তমপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র নয়, তোয়াকুল, পশ্চিম জাফলং ও আলীরগাঁও স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও বর্তমানে কোনো জনবল নেই। এসব কেন্দ্রে কর্মরতরা অবসরে যাওয়ার পর নতুন করে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, বর্তমানে একজন পরিদর্শিকা সপ্তাহে একদিন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে ভাতাভোগীদের খোঁজখবর নেওয়া এবং গর্ভবতী নারীদের চেকআপ ও বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকেন। রুস্তমপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সর্বশেষ রাবেয়া খাতুন নামে একজন ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা কর্মরত ছিলেন। তিনি অবসরে যাওয়ায় পদটি শূন্য হয়ে পড়ে।
বদরুল ইসলাম আরও বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সাত থেকে আট লাখ টাকার সংস্কারকাজ করা হলেও নিরাপত্তা, জনবল ও ওষুধপত্রের অভাবে বর্তমানে এটি উঠতি বয়সী মাদকাসক্তদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, একসময় এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ছিল রুস্তমপুর ইউনিয়নের শত শত মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা। বিশেষ করে প্রসূতি মা ও দরিদ্র রোগীদের জন্য কেন্দ্রটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এখন চিকিৎসাসেবা নিতে তাদের দূরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হচ্ছে।
তাদের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সরবরাহের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সরকারি সম্পদ চুরি এবং সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডার অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি স্থাপনাটি আরও বড় ধরনের অপরাধ ও মাদকসেবনের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।





