
রংপুর ব্যুরো
রংপুর নগরীর বাবুপাড়া এলাকায় বুড়িমারী থেকে পার্বতীপুরগামী কমিউটার ট্রেনের ইঞ্জিন ও একটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রংপুর রেলস্টেশন এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে কোনো যাত্রী হতাহত না হলেও রংপুর-লালমনিরহাট রুটে প্রায় দেড় ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। দুর্ঘটনার পর রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। লাইনচ্যুত ইঞ্জিন ও বগি সরিয়ে নেওয়ার পর রেললাইন সচল করা হয়। পরে ওই পথে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনায় দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। রেলওয়ে ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লালমনিরহাটের বুড়িমারী থেকে ছেড়ে আসা ৪৬১ নম্বর কমিউটার ট্রেনটি পার্বতীপুরের উদ্দেশে রওনা দেয়। ট্রেনটি রংপুর রেলস্টেশন এলাকায় পৌঁছানোর পর নির্ধারিত ৩ নম্বর লাইনে প্রবেশ করে। স্টেশনের পয়েন্ট অতিক্রম করার কিছুক্ষণ পরই ইঞ্জিনের কয়েকটি চাকা হঠাৎ রেললাইন থেকে পড়ে যায়। একই সঙ্গে ট্রেনটির পেছনের একটি বগির কয়েকটি চাকাও লাইনচ্যুত হয়। হঠাৎ ইঞ্জিন ও বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে ট্রেনের গতি কম থাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে জানান যাত্রীরা। দুর্ঘটনায় কোনো যাত্রী হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর রেলওয়ের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। লাইনচ্যুত ইঞ্জিন ও বগি সরিয়ে রেললাইন পরিষ্কার করা হয়। পরে কুড়িগ্রাম থেকে ইঞ্জিন এনে লাইনচ্যুত ইঞ্জিনটি সরিয়ে নেওয়া হয় এবং বগিগুলো আলাদা করে ১ নম্বর লাইনে রাখা হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রেললাইন স্বাভাবিক হলে ট্রেন চলাচলও পুনরায় শুরু হয়।
### রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন
দুর্ঘটনার পর রংপুর রেলস্টেশনের কয়েকটি লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও যাত্রীরা। প্রত্যক্ষদর্শী নাঈম ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ৩ নম্বর লাইনে দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ সংস্কার করা হয়নি। ১ ও ২ নম্বর লাইনে পাথর দেওয়া হলেও ৩ ও ৪ নম্বর লাইনে পর্যাপ্ত পাথর নেই। লাইনের এমন অবস্থার কারণে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, রংপুর একটি বিভাগীয় শহর এবং এ স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী যাতায়াত করেন। গুরুত্বপূর্ণ এই স্টেশনের সবগুলো লাইন নিরাপদ ও চলাচল উপযোগী রাখা জরুরি। ট্রেনের যাত্রী নূর মোহাম্মদ বলেন, দুর্ঘটনার সময় ট্রেনের গতি স্বাভাবিক ছিল এবং স্টেশনে প্রবেশের কারণে গতি কম ছিল। গতি বেশি থাকলে দুর্ঘটনার মাত্রা আরও ভয়াবহ হতে পারত। কম গতির কারণে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলেও তিনি মনে করেন। নূর মোহাম্মদ আরও বলেন, রংপুর রেলস্টেশনে কয়েকটি লাইন থাকলেও সবগুলোর অবস্থা সমান নয়। কিছু লাইনে পাথর ও অন্যান্য উপকরণ থাকলেও একটি লাইনের অবস্থা বেশ খারাপ। ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তার স্বার্থে স্টেশনের সবগুলো লাইন নিয়মিত পরীক্ষা ও সংস্কার করা প্রয়োজন। আরেক প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মালবাহীসহ বিভিন্ন ট্রেন এই রেলপথ দিয়ে চলাচল করছে। কিন্তু ৩ নম্বর লাইনে ট্রেন নেওয়ার আগে সেটি যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। রেললাইনের অবস্থা ও পয়েন্ট ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তদন্তে তা বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশা করেন।
### ‘নির্ধারিত পথেই ট্রেনটি চলছিল’
তবে স্থানীয়দের অভিযোগের সঙ্গে একমত নন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। রংপুর রেলস্টেশনের স্টেশন সুপারিনটেনডেন্ট আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বুড়িমারী থেকে আসা ট্রেনটির নির্ধারিত পথই ছিল ৩ নম্বর লাইন। ট্রেনটি স্টেশনের পয়েন্ট অতিক্রম করার পর সামনের দিকে গিয়ে ইঞ্জিনের কয়েকটি চাকা লাইনচ্যুত হয়। একই সময়ে পেছনের একটি বগির কয়েকটি চাকাও লাইন থেকে পড়ে যায়। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করা হয়। কুড়িগ্রাম থেকে ইঞ্জিন এনে লাইনচ্যুত ইঞ্জিনটি সরিয়ে নেওয়া হয়। বগিগুলো আলাদা করে ১ নম্বর লাইনে রাখা হয়। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত অংশের কাজ সম্পন্ন করে রেললাইন স্বাভাবিক করা হয়। বর্তমানে রংপুর স্টেশনে ট্রেন চলাচলে কোনো সমস্যা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
### চার সদস্যের তদন্ত কমিটি
এদিকে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে। লালমনিরহাট অঞ্চলের বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) ধীমান ভৌমিক জানান, ফারুকুল ইসলাম মানিককে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন, রেললাইন, পয়েন্ট, ইঞ্জিন ও লাইনচ্যুত বগির কারিগরি বিষয় পর্যালোচনাসহ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেবে। তদন্ত শেষে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও যাত্রীরা রেললাইনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ অংশ দ্রুত সংস্কার এবং ট্রেন চলাচলের আগে লাইন ও পয়েন্ট যথাযথভাবে পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন।যদিও দুর্ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে ইঞ্জিন ও বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় রংপুরের গুরুত্বপূর্ণ রেলপথের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তদন্তের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কার ও তদারকি জোরদারের দাবি উঠেছে।





