
রংপুর ব্যুরো
বাংলাদেশের নারী ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি এখন রংপুর। বিশেষ করে রংপুরের পালিচড়া যেন দেশের নারী ফুটবলের এক উর্বর জনপদ। এখানকার কিশোরীরা একের পর এক জাতীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্টে সাফল্য এনে শুধু রংপুরকেই নয়, গোটা উত্তরাঞ্চলকেই গর্বিত করেছে। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার নতুন স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামছে রংপুর জেলা প্রমিলা ফুটবল দল। লক্ষ্য একটাই—জাপান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (জেএফএ) সহযোগিতায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) আয়োজিত জেএফএ অনূর্ধ্ব-১৪ ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম-২০২৬-এ ষষ্ঠবারের মতো শিরোপা জিতে ‘হেক্সা’ ইতিহাস গড়া। সম্প্রতি নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬-এ দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আত্মবিশ্বাসে উজ্জ্বল রংপুরের ফুটবলকন্যারা এখন আরও বড় মঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার অপেক্ষায়। দীর্ঘদিনের কঠোর অনুশীলন, অভিজ্ঞ কোচিং স্টাফের পরিকল্পনা এবং দলীয় সমন্বয়ের কারণে এবারের আসরেও রংপুরকে অন্যতম ফেবারিট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আগামী শুক্রবার থেকে টাঙ্গাইল স্টেডিয়ামে শুরু হচ্ছে মর্যাদাপূর্ণ এই টুর্নামেন্ট। উদ্বোধনী দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে বিকেল সাড়ে ৪টায় ঝিনাইদহের বিপক্ষে মাঠে নামবে রংপুর। এরপর ৯ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং ১১ আগস্ট স্বাগতিক টাঙ্গাইলের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের ম্যাচ খেলবে তারা। গ্রুপপর্ব শেষে সেরা দুই দল জায়গা করে নেবে সেমিফাইনালে। আগামী ১৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে সেমিফাইনাল এবং ১৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল।
#দলকে বিদায় জানাতে প্রীতিভোজ ও অনুপ্রেরণামূলক আলোচনা
টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে বুধবার (৫ আগস্ট) পালিচড়া স্টেডিয়ামে আয়োজন করা হয় প্রীতিভোজ ও আলোচনা সভা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রংপুর জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনজুর হোসেন আজাদ, সহ-সভাপতি শামীম খান মিসকিন, জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা মাসুদ রানা, বাফুফের কোচ মিলন মিয়া, ক্রীড়া সংগঠক ও সিনিয়র সাংবাদিক সরকার মাজহারুল মান্নান, সদ্যপুষ্করণী যুব স্পোর্টিং ক্লাবের উপদেষ্টা ফরহাদুজ্জামান ফারুক, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হারুন উর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলামসহ ক্রীড়াঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠানে খেলোয়াড়দের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয় এবং সাফল্যের জন্য দোয়া করা হয়। বক্তারা বলেন, রংপুরের মেয়েরা দেশের নারী ফুটবলের মানচিত্রে যে সম্মান এনে দিয়েছে, তা ধরে রাখতে হলে একই আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও পরিশ্রম নিয়ে মাঠে খেলতে হবে।
#’পালিচড়ার মেয়েরা এখন বাংলাদেশের গর্ব’
রংপুর জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনজুর হোসেন আজাদ বলেন, “পালিচড়া আজ শুধু রংপুরের নয়, পুরো বাংলাদেশের পরিচিত একটি নাম। এখানকার মেয়েরা ধারাবাহিকভাবে দেশের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রমাণ করেছে, প্রতিভা কোনো অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে তারা আবারও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে। এবার আমাদের লক্ষ্য জেএফএ অনূর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্টের শিরোপা ধরে রাখা।”
তিনি আরও বলেন, “ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আমরা মাঠে নামছি। আমার বিশ্বাস, প্রতিটি খেলোয়াড় নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে খেলবে। আমরা আবারও চ্যাম্পিয়ন ট্রফি রংপুরে আনতে চাই। মেয়েরা যদি সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারে, তাহলে তাদের জন্য আকর্ষণীয় পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হবে।”
#কোচের চোখে আত্মবিশ্বাসী রংপুর
দলের প্রধান কোচ রুমা আক্তার বলেন, “রংপুর দল ২০১৪, ২০১৬, ২০১৯, ২০২১ ও ২০২৫ সালে জেএফএ অনূর্ধ্ব-১৪ ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এবার আমাদের লক্ষ্য ষষ্ঠবারের মতো শিরোপা জয় করা। মেয়েরা নিয়মিত অনুশীলন করেছে। তাদের ফিটনেস, মানসিক দৃঢ়তা ও দলীয় সমন্বয় আগের চেয়ে অনেক ভালো। আমরা আশাবাদী, এবারও ভালো ফল নিয়ে ফিরতে পারব। তিনি বলেন, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের সাফল্য দলের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং সেই ইতিবাচক মনোভাব নিয়েই মেয়েরা টাঙ্গাইলে যাচ্ছে।”
#অধিনায়কের কণ্ঠে জয়ের প্রত্যয়
দলের অধিনায়ক অনন্যা খানম বলেন, “আমাদের সবাই খুব ভালো ফর্মে আছে। কোচদের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। নতুন কুঁড়ির শিরোপা আমাদের আরও অনুপ্রাণিত করেছে। আমরা চাই, প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের সেরাটা দিয়ে খেলতে এবং ষষ্ঠবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়ে রংপুরবাসীকে আনন্দ উপহার দিতে।”
### **নারী ফুটবলে রংপুরের সোনালি অধ্যায়
এক সময় অবহেলিত নারী ফুটবল আজ রংপুরে এক গর্বের নাম। প্রত্যন্ত গ্রামের অসংখ্য কিশোরী ফুটবলকে ভালোবেসে জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে। পালিচড়াসহ রংপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়রা বয়সভিত্তিক জাতীয় দলেও জায়গা করে নিয়েছে। স্থানীয় কোচ, অভিভাবক, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং ক্রীড়াপ্রেমীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে এই সাফল্যের ভিত্তি। রংপুরের মেয়েদের কাছে জেএফএ অনূর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্ট শুধুমাত্র একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার আরেকটি বড় মঞ্চ। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তাদের প্রতিটি ম্যাচই থাকবে বাড়তি চাপ ও প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে।
#আট জেলার লড়াই, নজর থাকবে রংপুরের দিকে
এবারের টুর্নামেন্টে দুটি গ্রুপে মোট আটটি জেলা অংশ নিচ্ছে। গ্রুপ-এ রংপুর, টাঙ্গাইল, ঝিনাইদহ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ। গ্রুপ-বি গাইবান্ধা, রাঙ্গামাটি, মাগুরা ও রাজবাড়ী। প্রতিটি গ্রুপের সেরা দুটি দল সেমিফাইনালে উঠবে। এরপর সেমিফাইনালের বিজয়ীরা ১৬ আগস্ট ফাইনালে শিরোপার জন্য লড়বে।
#স্বপ্ন এখন হেক্সা
রংপুরের ফুটবলকন্যাদের সামনে এখন একটাই লক্ষ্য—ষষ্ঠবারের মতো জেএফএ অনূর্ধ্ব-১৪ ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের ট্রফি জিতে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করা। নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের সাফল্য, পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং দুর্দান্ত দলীয় সমন্বয় রংপুরকে দিয়েছে বাড়তি আত্মবিশ্বাস। এখন অপেক্ষা মাঠের লড়াইয়ের। টাঙ্গাইলের সবুজ ঘাসে যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে পারে রংপুরের মেয়েরা, তবে আরেকটি গৌরবময় অধ্যায় যোগ হবে উত্তরাঞ্চলের নারী ফুটবলের ইতিহাসে হেক্সা মিশন পূরণের মধ্য দিয়ে।





