
রংপুর ব্যুরো
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ৬ নম্বর রাধানগর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মানসিংহপুর নয়া পাড়া গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রামীণ সড়ক দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে অবহেলা আর অযত্নে পড়ে রয়েছে। একসময় এই সড়কটি ছিল দুটি ইউনিয়নের মানুষের জন্য উপজেলা সদরে যাতায়াতের সবচেয়ে সহজ, স্বল্প দূরত্বের এবং ব্যস্ত যোগাযোগপথ। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে বর্তমানে সেটি যেন মৃত্যুপথযাত্রী। বর্ষা এলেই কাদার সাগরে পরিণত হয় সড়কটি, আর শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় অসংখ্য গর্ত, উঁচু-নিচু ও ভাঙাচোরা অংশ। ফলে প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষকে।স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ২০ বছর ধরে সড়কটির কোনো বড় ধরনের সংস্কার হয়নি। মাঝে মধ্যে কিছু স্থানে মাটি ফেলে দায়সারা কাজ করা হলেও তা বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতেই ধুয়ে যায়। ফলে বছরের অধিকাংশ সময়ই সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে থাকে।
গ্রামবাসীরা জানান, একসময় এই সড়ক দিয়ে রাধানগর ইউনিয়ন ও পাশের ইউনিয়নের মানুষ সহজেই বদরগঞ্জ উপজেলায় যাতায়াত করতেন। কৃষিপণ্য, সবজি, ধান, পাট, দুধসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের জন্যও এটি ছিল অন্যতম প্রধান পথ। কিন্তু বর্তমানে সড়কের এমন বেহাল অবস্থার কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে কয়েক কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে উপজেলা সদরে যেতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে যাতায়াত ব্যয়ও।
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো সড়ক কাদায় ঢেকে যায়। কোথাও কোথাও হাঁটুসমান কাদা জমে থাকে। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী এবং বৃদ্ধদের জন্য এই সড়ক ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মোটরসাইকেল, অটোরিকশা কিংবা ভ্যানচালকেরাও ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেন। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে এবং যানবাহন কাদায় আটকে পড়ার ঘটনাও নিয়মিত।
শুধু বর্ষায় নয়, শুষ্ক মৌসুমেও সড়কটির দুর্দশা কম নয়। রাস্তার বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও উঁচু-নিচু অংশ সৃষ্টি হওয়ায় যানবাহন চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ধুলাবালির কারণে আশপাশের পরিবেশও দূষিত হচ্ছে। এতে পথচারীদের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু রাস্তার দুরবস্থার কারণে সময়মতো কৃষিপণ্য বাজারে নিতে পারেন না। বর্ষাকালে অনেক সময় উৎপাদিত সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য গ্রামের মধ্যেই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে কৃষকদের।
মানসিংহপুরে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের কিস্তি আদায়ে আসা এক কর্মকর্তা বলেন, “গ্রামের মানুষের কাছে নিয়মিত আসতে হয়। কিন্তু এই রাস্তার কারণে যাতায়াতে প্রচণ্ড কষ্ট হয়। বর্ষাকালে মোটরসাইকেল চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় হেঁটেই যেতে হয়। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের এই অবস্থা সত্যিই দুঃখজনক।”
স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না। বৃষ্টি হলে সবাই কাদা মাড়িয়ে চলাচল করে। অনেক সময় পড়ে গিয়ে আহত হয়। আমরা বহুবার জনপ্রতিনিধিদের জানিয়েছি, কিন্তু কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা হয়নি।”
গ্রামবাসী সিরাজুল ইসলাম সিরাজ বলেন, “এই রাস্তা একসময় দুই ইউনিয়নের মানুষের প্রাণের রাস্তা ছিল। এখন মানুষ বাধ্য হয়ে অনেক দূরের রাস্তা ব্যবহার করছে। আমাদের গ্রামের উন্নয়নের কথা কেউ চিন্তা করে না। বছরের পর বছর শুধু আশ্বাসই শুনে যাচ্ছি।”
সমাজকর্মী মোরশেদুল হক বলেন, “যোগাযোগ ব্যবস্থা একটি এলাকার উন্নয়নের প্রধান শর্ত। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। রাস্তা ভালো না থাকায় কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দ্রুত এলজিইডির মাধ্যমে সড়কটির টেকসই উন্নয়ন প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে বদরগঞ্জ উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর উপজেলা প্রকৌশলী মো. হারুন অর রশীদ বলেন, “সড়কটির বিষয়ে আমাদের দপ্তরে তথ্য রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে উন্নয়ন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হবে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত সংস্কার বা উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের মতে, একটি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা শুধু মানুষের যাতায়াত সহজ করে না, বরং একটি এলাকার অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ দীর্ঘ ২০ বছর ধরে অবহেলায় পড়ে থাকা এই সড়কটি যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরের বাইরেই রয়ে গেছে।
গ্রামবাসীর দাবি, আর কোনো আশ্বাস নয়—অবিলম্বে সড়কটি পাকা করে চলাচলের উপযোগী করা হোক। তাহলে দুই ইউনিয়নের হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটবে এবং এলাকার সার্বিক উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।





