
রংপুর ব্যুরো
ভারতের উজানে টানা ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদী তিস্তা আবারও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। কয়েকদিন ধরে পানি বাড়া-কমার প্রবণতা থাকলেও মঙ্গলবার রাত থেকে নদীর পানি অস্বাভাবিক গতিতে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। বুধবার (৫ আগস্ট) সকাল ৯টায় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। একই পরিস্থিতি সকাল ১০টা পর্যন্তও বজায় ছিল।
পানির এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘিরে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা তীরবর্তী মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম উদ্বেগ। ইতোমধ্যে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। তলিয়ে যাচ্ছে শত শত একর ফসলি জমি, গ্রামীণ সড়ক, মাছের ঘের ও বসতভিটা। হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেও নদীপাড়ের মানুষের আশঙ্কা—উজানে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের পার্বত্য এলাকায় কয়েকদিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সেই বৃষ্টির পানি পাহাড়ি ঢল হয়ে তিস্তা নদীতে নেমে আসায় হঠাৎ করেই নদীর পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিচের দিকে প্রবাহিত হতে পারে।
### সকাল থেকেই বিপৎসীমার ওপরে পানি
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৯টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানির সমতল রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ২৮ মিটার, যেখানে বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। অর্থাৎ পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সকাল ৬টা থেকেই পানি এই অবস্থানে ছিল এবং সকাল ১০টাতেও একই মাত্রায় প্রবাহ বজায় থাকে। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডালিয়া ও আশপাশের এলাকায় ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে স্থানীয়ভাবে বৃষ্টির পানি এবং উজানের ঢল মিলিয়ে বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
## প্লাবিত হচ্ছে একের পর এক এলাকা
তিস্তার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী ও গয়াবাড়ী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়েছে। পাশাপাশি জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী ও শৌলমারী ইউনিয়নের বিভিন্ন নিচু এলাকাও প্লাবিত হতে শুরু করেছে।লালমনিরহাট জেলার তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতি হচ্ছে। বহু গ্রামের রাস্তাঘাট পানির নিচে চলে যাওয়ায় নৌকা ও ভেলাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। স্কুলগামী শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
## পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছেই
বন্যার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা। অনেক পরিবার শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ করতে শুরু করেছে।চরাঞ্চলের মানুষের অভিযোগ, প্রতিবছর একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে বর্ষা এলেই তাদের জীবনে নেমে আসে দুর্ভোগ।
## “পানি দেখে মনে হচ্ছে বড় বন্যা হতে পারে”
লালমনিরহাটের পাটিকাপাড়া ইউনিয়নের চরাঞ্চলের বাসিন্দা জমির উদ্দিন বলেন, “বিকেল থেকেই পানি হু হু করে বাড়ছে। ইতোমধ্যে অনেক বাড়িতে পানি ঢুকে গেছে। পানির চাপ দেখে মনে হচ্ছে বড় ধরনের বন্যা হতে পারে। বন্যা এলেই আমাদের নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। ঘরবাড়ি, গবাদিপশু আর সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে থাকতে হয়। মহিষখোচা চরের বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, “কয়েকদিন ধরে পানি বাড়া-কমা করছিল। কিন্তু সোমবার থেকে হঠাৎ করেই পানি অনেক বেড়ে গেছে। এখন অনেক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। যদি পানি আরও বাড়ে তাহলে ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হবে।”
## তলিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি
পানির তোড়ে তিস্তা নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ কৃষিজমি তলিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমন ধানের বীজতলা, শাকসবজি,ও অন্যান্য মৌসুমি ফসল পানির নিচে চলে যাওয়ায় কৃষকদের মাথায় হাত পড়েছে। কৃষকরা জানান, কয়েক মাসের পরিশ্রম মুহূর্তের মধ্যে পানিতে ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। পানি দ্রুত না কমলে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা।
## ঝুঁকিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ
তীব্র স্রোতের কারণে তিস্তা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলোও চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নদীর বিভিন্ন অংশে বাঁধের পাদদেশে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি আরও বাড়লে যেকোনো সময় বাঁধে ভাঙন দেখা দিতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বাঁধগুলোর স্থায়ী সংস্কার করা হয়নি। প্রতিবছর বর্ষাকালে জরুরি সংস্কারের নামে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হলেও স্থায়ী সমাধান হয় না। তাদের ভাষ্য, শুষ্ক মৌসুমে পরিকল্পিতভাবে বাঁধ মেরামত করা হলে প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনের এমন আতঙ্কে থাকতে হতো না।
## ৪৪টি জলকপাট খুলে পানি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা
পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিস্তা ব্যারাজের সব ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নদীর নিম্নাঞ্চলে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে এতে নিচের এলাকার বন্যা পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
## পানি উন্নয়ন বোর্ড যা বলছে
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, “ভারতের উজানে ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বুধবার সকাল ৬টা থেকেই তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সকাল ৯টা ও ১০টাতেও একই অবস্থা ছিল। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।”
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার রায় বলেন, “উজানের ঢলে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদী তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রস্তুত রয়েছেন।”
## প্রশাসনের সতর্কতা
স্থানীয় প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ যৌথভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, শুকনো খাবার মজুত এবং উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার কাজ শুরু হয়েছে। নদীপাড়ের বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া নদীতে না যেতে এবং শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপদ স্থানে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
## আবারও তিস্তার অভিশাপ
উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে তিস্তা নদী যেমন আশীর্বাদ, তেমনি বর্ষা মৌসুমে এটি হয়ে ওঠে ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। প্রায় প্রতি বছরই উজানের ঢলে তিস্তা ফুলেফেঁপে ওঠে। হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারায়, ফসল নষ্ট হয়, ভেঙে যায় সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। স্থায়ী নদীশাসন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং তিস্তার পানিব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের দাবি বহুদিনের হলেও কার্যকর সমাধান এখনও দৃশ্যমান নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে আবহাওয়া ও উজানের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে তিস্তার পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। নদীপাড়ের মানুষের চোখে-মুখে এখন একটাই প্রশ্ন এবারও কি ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে উত্তরাঞ্চল?





