জলাবদ্ধ ঢাকা: বৃষ্টির চেয়ে বড় সংকট পরিকল্পনায়

Date:

spot_img

এলিন মাহবুব

সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং আরও কয়েকটি জেলায় ব্যাপক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ পানিবন্দী হয়েছে, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হয়েছে। একই সময়ে রাজধানী ঢাকায় টানা বৃষ্টির ফলে বহু এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। এতে অফিসগামী মানুষ দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং জরুরি চিকিৎসাসেবায়ও বিঘ্ন ঘটে।

অনেকেই ঢাকার জলাবদ্ধতার জন্য কেবল অতিবৃষ্টিকে দায়ী করেন। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। নগর পরিকল্পনা ও পানি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর জলাবদ্ধতার পেছনে খাল ভরাট, জলাধার দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ন, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের গবেষণাগুলোও দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার প্রাকৃতিক খাল, নিম্নভূমি ও জলাধার সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে আসছে। ফলে স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাত হলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না।

তাই রাজধানীর জলাবদ্ধতা শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত দুর্বলতারও প্রতিফলন।

ঢাকা বাংলাদেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল, হাজারো ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি কার্যক্রম এই শহরকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়। ফলে রাজধানী কয়েক ঘণ্টার জন্যও অচল হয়ে গেলে তার প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ে। উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়, ব্যবসায়িক লেনদেনে বিলম্ব ঘটে এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরম আবহাওয়ার ঘটনার তীব্রতা ও ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল—আইপিসিসির মূল্যায়ন অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নগর বন্যা ও জলাবদ্ধতার আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এই বাস্তবতায় বর্তমান অবকাঠামো ও নগর পরিকল্পনা অপরিবর্তিত থাকলে ভবিষ্যতে ঢাকার জলাবদ্ধতা ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মিত নগর সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকার জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয়। রাজধানী বাংলাদেশের প্রশাসনিক, আর্থিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় কয়েক ঘণ্টার জন্যও শহরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়ে এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। বিশ্বব্যাংকের নগর উন্নয়ন ও জলবায়ু-সংক্রান্ত গবেষণায়ও উল্লেখ করা হয়েছে যে জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ না করলে নগর বন্যা ও জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক ক্ষতি ক্রমেই বাড়তে পারে।

জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়, ফলে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি দূষিত পানির সংস্পর্শে ডায়রিয়া, চর্মরোগ এবং অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রকোপও বাড়তে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চের বিভিন্ন নির্দেশিকা ও গবেষণায় বন্যা-পরবর্তী সময়ে এসব জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান সংকট কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত ঘাটতির ফল। তাই এর সমাধানও হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি। খাল পুনরুদ্ধার, জলাধার সংরক্ষণ, আধুনিক স্টর্ম-ওয়াটার ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় ছাড়া ঢাকার জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে কমানো কঠিন হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন শহরের অভিজ্ঞতা দেখায়, কার্যকর নগর পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে নগর বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতায় অনেক দেশ পানি নিষ্কাশনের প্রচলিত ধারণা থেকে সরে এসে প্রকৃতিনির্ভর ও জলবায়ু-সহনশীল নগর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আইপিসিসির মূল্যায়নেও নগর অঞ্চলে প্রকৃতিনির্ভর অবকাঠামো এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

সিঙ্গাপুর বৃষ্টির পানিকে কেবল নিষ্কাশনের বিষয় হিসেবে নয়, একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে। দেশটির ‘ABC Waters Programme’-এর মাধ্যমে খাল, জলাধার, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানকে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে স্থানীয় বন্যার ঝুঁকি কমানো, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং নগর পরিবেশ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এই কর্মসূচি নগর পরিকল্পনার সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জনসম্পৃক্ততাকেও যুক্ত করেছে।

চীনের ‘স্পঞ্জ সিটি প্রোগ্রাম’-এর মূল ধারণা হলো শহরের পার্ক, ফুটপাত, উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ অবকাঠামো এমনভাবে নকশা করা, যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত ড্রেনে চলে না গিয়ে যতটা সম্ভব মাটিতে শোষিত ও প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত হয়। এর ফলে জলাবদ্ধতা কমে, একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং নগর পরিবেশের স্থিতিস্থাপকতাও বৃদ্ধি পায়।

নেদারল্যান্ডসের রটারডাম ‘ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন স্ট্র্যাটেজি’ এবং ‘Room for the River’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে পানি প্রবাহের জন্য অধিক স্থান সৃষ্টি, জলাধার সংরক্ষণ এবং জলবায়ু-সহনশীল নগর অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। এসব উদাহরণ দেখায়, নগর গড়ে ওঠে প্রকৃতিকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরিকল্পনার অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার মাধ্যমে।

বাংলাদেশের জন্যও এখন সময় এসেছে প্রতিক্রিয়াশীল নয়, দূরদর্শী নগর ব্যবস্থাপনার পথে এগিয়ে যাওয়ার। প্রতি বর্ষায় নালা পরিষ্কার বা জরুরি ভিত্তিতে পাম্প বসিয়ে পানি অপসারণ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু তা স্থায়ী সমাধান নয়। রাজধানীর খাল, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথগুলোকে আইনি সুরক্ষা দিয়ে পুনরুদ্ধার করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন নগর উন্নয়ন প্রকল্পে জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

রাজউক, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগকে অনিবার্য ভাগ্য হিসেবে মেনে নেব, নাকি এই সংকটকে বিজ্ঞানভিত্তিক ও জলবায়ু-সহনশীল নগর পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার একটি সুযোগ হিসেবে দেখব?

ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো অনিবার্য ভাগ্য নয়; এটি মানুষের তৈরি একটি সংকট, যার সমাধানও মানুষের হাতেই। কারণ পানি কখনো শত্রু নয়; প্রকৃত সমস্যা সেই পরিকল্পনা, যা পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...