
খুলনা থেকে রাজিবুল ইসলাম রাজিব
খুলনা বিভাগে একদিনে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি ৪৬ জন, মোট আক্রান্ত ১৫৭২, ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৭জন,আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ডেঙ্গুতে খুলনা এখন উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। বর্ষা মৌসুমের শুরুতে প্রতিদিনই নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আক্রান্ত মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক’ (স্বাস্থ্য) কার্যালয়, খুলনা বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগজুড়ে নতুন করে ৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ের মধ্যে ৭ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। তবে খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে নেই বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা।খুলনার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। যার ফলে খুলনা এখন রয়েছে উচ্চ ঝুঁকিতে।
খুলনা বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য ) ডা: শেখ মো: মোশাররফ হোসেন জানান, চলতি বছরে ১ জানুয়ারি থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত খুলনা বিভাগে মোট ১,৫৭২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১,৩৬০ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ১৮১ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া এ সময়ের মধ্যে ২৪ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়েছে।
সুত্র জানায়, জেলাভিত্তিক নতুন ভর্তি রোগীর মধ্যে বাগেরহাটে সর্বোচ্চ ২২ জন, খুলনা জেলায় ১২ জন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১ জন, যশোরে ৭ জন, কুষ্টিয়ায় ১ জন এবং মেহেরপুরে ১ জন ভর্তি হয়েছেন। চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল, সাতক্ষীরা ও সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন কোনো রোগী ভর্তি হয়নি।
অদ্যাবধি সর্বোচ্চ আক্রান্তের তালিকায় রয়েছে বাগেরহাট, যেখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫৩০ জন। এরপর রয়েছে খুলনা জেলা (৩১১ জন) এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ
হাসপাতাল (২৭৫ জন)। যশোরে মোট আক্রান্ত ১৭৯ জন, নড়াইলে ৯৬ জন, মাগুরায় ৫৪ জন, কুষ্টিয়ায় ৪৪ জন, মেহেরপুরে ৪০ জন, ঝিনাইদহে ২২ জন, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬ জন এবং সাতক্ষীরা জেলায় ৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। এ পর্যন্ত খুলনা জেলায় ডেঙ্গুতে মারা গেছে ৭ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যাও উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গত ২৪ ঘন্টায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে ৪১ জন আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ নিয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ১৯৩ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ ছাড়াও বরিশাল বিভাগের দুটি জেলা পিরোজপুর ও ঝালকাঠির অধিকাংশ রোগীকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হচ্ছে চিকিৎসার জন্য। খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয় ও মেডিকেল কলেজ ( খুমেক) হাসপাতাল সুত্রে এই তথ্য জানাগেছে। ইতি মধ্যে উন্নত চিকিৎসার জন্য ২৪ জনকে রেফার্ড করা হয়েছে।
খুলনা জেলা সিভিল সার্জন সুত্রে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৩২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩১ জন। বর্তমানে ২২ জুলাই খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলার হাসপাতাল গুলোতে ১৯৩ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন সাতজন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক কর্মকর্তা (আরএমও) ডাক্তার সুহাষ রঞ্জন হালদার আমাদের সময়কে জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে ২১ জন রোগী। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৩ জন। বর্তমানে এই হাসপাতালে ৮৬ জন ভর্তি রয়েছে। এছাড়া চলতি বছর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোট ৮৪০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৪৬ জন।
খুলনা জেলা সিভিল সার্জন ডা: মোছা: মাহফুজা খাতুন ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রের আশংকা চলতি বছর আগষ্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। সূত্রের দাবি দীর্ঘদিনের গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলায় এডিস মশার বিস্তার এবং ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে খুলনা ও বাগেরহাট জেলায় সংক্রমনের আশঙ্কা খুব বেশি। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ডেঙ্গু মূলত ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও তা এখন দেশের প্রায় সব জেলা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন মানুষের যাতায়াতের সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশার কিছু না কিছু জীবানু বহন করছেন। ফলে ডেঙ্গু এখন আর কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলের রোগ নয়। সুত্র জানায়, গবেষণায় আরো দেখা গেছে এডিস মশার আচরণেও পরিবর্তনে এসেছে। আগে ধারণা ছিল এডিস মশা শুধু পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে, কিন্তু বর্তমানে নোংরা পানিতে ও এডিস মশার প্রজনন হচ্ছে। ফলে পরিষ্কার পানি নয় যেকোনো স্থানে জমে থাকা পানি ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
সাধারণ ভাবে অনেকেই মনে করেন, বর্ষাকাল শেষ হলে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও কমে যায়। বাস্তবে চিত্রটি ভিন্ন। বর্ষাকালে এডিস মশার প্রজনন বৃদ্ধি পায় এবং আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তাই এই সময়টিকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মশার সংখ্যা কম মনে হলেও এতে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কারণ ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য অল্প সংখ্যক এডিস মশাই যথেষ্ট। তাই দিনে বা রাতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার, শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরা এবং মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডাক্তার সুহাষ রঞ্জন হাওলাদার পরামর্শ দিয়েছেন।
সুত্রে আরো জানান, অধিকাংশ বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, দেশে মশা নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও অধিকাংশ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে। অথচ ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস মশা, যার প্রজননস্থল ড্রেন বা নর্দমা নয়; বরং বাসা-বাড়ির ফুলের টব, বালতি, ড্রাম, বেজমেন্ট, ছাদ, গাড়ির পার্কিং এবং বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি। ফলে এসব স্থানকে লক্ষ্য করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
ফগিং বা ধোঁয়া প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে এই পদ্ধতি সীমিত বা বন্ধ করেছে। বিশেষজ্ঞরা পরিবেশ বান্ধব লার্ভিসাইড ও আইজিআর ব্যবহারের পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
এদিকে কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মন্জু বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জেলা প্রশাসন ও খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) এবং স্বাস্থ্য বিভাগ যৌথভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে নিয়মিত বিশেষ ড্রাইভ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে। স্থানীয় ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইমাম, শিক্ষক ও রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ত করে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত করা হচ্ছে। নির্মাণাধীন ভবন বা বাড়ির আশেপাশে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানাসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ডেঙ্গু সংক্রান্ত যেকোনো জরুরি তথ্য, পরীক্ষা এবং চিকিৎসা সহায়তার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং খুলনা জেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতিটি পরিবারের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির আঙিনা, ছাদ, বেজমেন্ট, বারান্দা কিংবা যেকোনো স্থানে কোনো পাত্রে যেন পানি জমে না থাকে, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। যেখানে পানি সরানো সম্ভব নয়, সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী লার্ভা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখনই তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, কমিউনিটি ভিত্তিক এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস অভিযান জোরদার করা। দ্বিতীয়ত, পরিবেশ বান্ধব লার্ভিসাইড বা আইজিআর প্রয়োগের মাধ্যমে লার্ভা নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে সম্ভাব্য রোগীর চাপ মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা। খুলনা বিভাগজুড়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জনের বেশি নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। খুলনার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যার ফলে খুলনা এখন উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন ও কেসিসিসহ সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যক্তি সচেতনতা, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত প্রস্তুতির মাধ্যমেই আসন্ন মাস গুলোতে সম্ভাব্য ডেঙ্গু সংকট মোকাবেলা করতে হবে।





