ষাট বছর ধরে অপেক্ষায় ছিল একটি ম্যাচ

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

প্রিয় পাঠক,
কিছু ম্যাচ শেষ হয়ে যায় রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে।
কিছু ম্যাচ থেকে যায় পুরোনো সংবাদপত্রের হলদে পাতায়।
আর কিছু ম্যাচ নীরবে অপেক্ষা করে। একদিন আবার শুরু হবে বলে।

ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে ভিলা পার্ক নামে একটি মাঠ আছে। ১৯৬৬ সালের জুলাইয়ের এক সন্ধ্যায় সেই মাঠে নেমেছিল আর্জেন্টিনা ও স্পেন। বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের একটি ম্যাচ। তখন কেউ জানত না, দুই দেশের ফুটবলের ইতিহাসে ম্যাচটি কতটা নিঃসঙ্গ হয়ে থাকবে।

কারণ সেই রাতের পর বিশ্বকাপের মঞ্চে আর কখনো মুখোমুখি হয়নি আর্জেন্টিনা ও স্পেন।

এক বছর নয়। এক দশক নয়। পেরিয়ে গেছে ষাট বছর।

এর মধ্যে পৃথিবী বদলেছে। ফুটবলের নিয়ম বদলেছে। সাদা-কালো টেলিভিশন রঙিন হয়েছে। খেলোয়াড়দের ভারী চামড়ার বুট বদলে এসেছে হালকা বুট। মাঠের পাশে বসেছে অসংখ্য ক্যামেরা। গোল নিয়ে মানুষের চোখের সন্দেহ মেটাতে এসেছে প্রযুক্তি।

শুধু ফিরে আসেনি সেই ম্যাচ।

১৯৬৬ সালের আর্জেন্টিনাকে ইউরোপ চিনত অন্যভাবে। শক্ত রক্ষণ। কঠিন শরীরী ফুটবল। আগে নিজেদের গোলপথ বন্ধ করা, তারপর সুযোগ পেলে আক্রমণ। স্পেনও হয়তো তেমন একটি আর্জেন্টিনার জন্যই প্রস্তুত ছিল।

কিন্তু সেদিন ভিলা পার্কে নেমেছিল অন্য এক দল।

খেলা শুরু হতেই আর্জেন্টিনা ছুটে গেল স্পেনের গোলের দিকে। কোনো অপেক্ষা নেই। কোনো হিসাব নেই। নিজেদের রক্ষণে বসে প্রতিপক্ষের ভুলের জন্য সময় নষ্ট করার ইচ্ছাও নেই। প্রথম মুহূর্ত থেকেই তারা যেন বলতে চেয়েছিল, এই রাতটি শুধু বেঁচে থাকার নয়। এই রাত জিতে নেওয়ার।

দ্য গার্ডিয়ানের তৎকালীন প্রতিবেদক সিরিল চ্যাপম্যান পরে লিখেছিলেন, মাঠে দেখা গিয়েছিল ‘নতুন এক আর্জেন্টিনা’কে।

সেই নতুন আর্জেন্টিনার আক্রমণের সামনে ছিলেন লুইস আর্তিমে।

সেন্টার ফরোয়ার্ডের জীবন বড় নিষ্ঠুর। মাঠে তাঁর চারপাশে অনেক মানুষ থাকলেও তিনি আসলে একা। গোল হলে সবাই তাঁকে জড়িয়ে ধরে। সুযোগ নষ্ট হলে হাজার মানুষের হতাশা এসে পড়ে তাঁর একার কাঁধে।

আর্তিমের রাতটিও শুরু হয়েছিল ব্যর্থতা দিয়ে।

একবার বল এলো তাঁর সামনে। একটু সময় নিলেন। সেই সামান্য সময়টুকুই তাঁকে দিল না স্পেনের রক্ষণ। আরেকবার গোলের পথ খুলে গেল। তবু বল জালে পাঠাতে পারলেন না। তারপর আরও একটি সুযোগ।

প্রতিবারই মনে হচ্ছিল, গোলটি খুব কাছে। অথচ কাছে গিয়েও যেন দূরে সরে যাচ্ছে।

স্পেন ধীরে ধীরে খেলায় ফেরার চেষ্টা করল। তাদের দলে ছিলেন লুইস সুয়ারেজ, ফ্রান্সিসকো হেন্তো ও লুইস দেল সোলের মতো ফুটবলার। তাঁরা বল ধরে খেলার গতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আর্জেন্টিনা সেদিন কাউকে স্বস্তিতে থাকতে দিতে আসেনি।

মাঠের লড়াই ক্রমে কঠিন হয়ে উঠল। ট্যাকলের পর ট্যাকল। একজন পড়ে যাচ্ছেন। উঠে আবার দৌড়াচ্ছেন। আঘাতের জবাব আসছে আরেকটি আঘাতে। একসময় মনে হয়েছিল, ফুটবল বুঝি সংঘর্ষে হারিয়ে যাবে।

বুলগেরিয়ান রেফারিকে কঠোর হতে হলো। তাঁর দৃঢ়তায় বড় কোনো গোলযোগ বাধেনি। কিন্তু ম্যাচের শরীরে তখন উত্তেজনার আঁচড় পড়ে গেছে।

প্রথমার্ধ শেষ হলো গোলশূন্য।

খেলোয়াড়েরা বিরতিতে গেলেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার আক্রমণ বিরতিতে যায়নি।

দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই আবার স্পেনের গোলমুখে ঢেউ তুলল তারা। আর্তিমে আবার সুযোগ পেলেন। আবার হারালেন। একজন গোলশিকারির জীবনে এমন সময় আসে, যখন বলটি যেন তাঁকে চিনতে অস্বীকার করে।

তারপর ভিলা পার্কের আকাশ বদলে গেল।

বৃষ্টি নামল।

মাঠ ভিজে গেল। ঘাসের ওপর বলের গতি বদলে গেল। গ্যালারিতে বসা দর্শকেরা শরীর গুটিয়ে নিলেন। ইংল্যান্ডের বৃষ্টি সাধারণত ফুটবলারের গতি কমিয়ে দেয়। কিন্তু সেদিন বৃষ্টি আর্জেন্টিনাকে থামাতে পারেনি।

বরং মনে হচ্ছিল, ভেজা মাঠের ওপর তারা আরও বেশি করে নিজেদের রেখে যেতে চায়।

ম্যাচের ৬৮ মিনিট।

সোলারি স্পেনের রক্ষণকে বিভ্রান্ত করে গোলের সামনে বল পাঠালেন। বলটি রক্ষণের লাল দেয়াল ভেদ করে এসে পড়ল আর্তিমের পায়ে।

এই আর্তিমেই একটু আগে সুযোগ হারিয়েছেন। এই আর্তিমের দিকেই হয়তো হতাশ চোখে তাকিয়েছিল তাঁর দল। সামনে গোলরক্ষক। পেছনে ব্যর্থতার কয়েকটি মুহূর্ত। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় খুব কম।

এবার তিনি ভুল করলেন না।

বল জালে গেল।

ভিলা পার্কের বৃষ্টির মধ্যে উল্লাসে ভেসে উঠল আর্জেন্টিনা। আর্তিমে দৌড়ালেন। সতীর্থেরা তাঁর দিকে ছুটে এলেন। কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটি নিজের সঙ্গে লড়ছিলেন, তিনি তখন দলের নায়ক।

কিন্তু ফুটবল কাউকে দীর্ঘ সময় নিশ্চিন্ত থাকতে দেয় না।

মাত্র ছয় মিনিট পর স্পেন ফিরে এলো। সুয়ারেজ গোলের সামনে এমন একটি বল পাঠালেন, যা আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক আন্তোনিও রোমার নাগালের একটু বাইরে ছিল। হোসে মারিয়া পেইরো সবার আগে সেখানে পৌঁছালেন।

রোমা হাত বাড়িয়েছিলেন। বলটিকে থামাতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর স্পর্শই যেন সেটিকে আরও ভেতরে ঠেলে দিল।

স্কোর ১-১।

আর্জেন্টিনার এত আক্রমণ, এত দৌড়, এত অপেক্ষা এক মুহূর্তে আবার শূন্যে ফিরে গেল।

অন্য কোনো দল হয়তো তখন একটু থামত। একটি পয়েন্ট বাঁচানোর কথা ভাবত। রক্ষণে লোক বাড়াত। কিন্তু সেদিনের আর্জেন্টিনা থামার জন্য মাঠে নামেনি।

স্পেন আক্রমণে গেল। আর্জেন্টিনা পাল্টা ছুটল। ভেজা মাঠের ওপর ম্যাচটি তখন দুলছিল এক গোলপোস্ট থেকে অন্য গোলপোস্টে। সময় ফুরিয়ে আসছিল। আর্তিমের সামনে হয়তো শেষ সুযোগটিই অপেক্ষা করছিল।

৭৯ মিনিটে রবার্তো পেরফুমোর কাছ থেকে বল পেলেন তিনি।

সামনে আবার সেই গোল। আবার গোলরক্ষক। আবার একটি সিদ্ধান্তের মুহূর্ত।

এবার আর কোনো দ্বিধা ছিল না।

আর্তিমের শক্তিশালী শট স্পেনের জালে গিয়ে থামল।

আর্জেন্টিনা ২, স্পেন ১।

ম্যাচের শুরুতে যে মানুষটি বারবার সুযোগ হারিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর দুই গোলেই জয় পেল আর্জেন্টিনা। ব্যর্থতাগুলো তখন আর ব্যর্থতা নয়। সেগুলো হয়ে গেল সাফল্যে পৌঁছানোর আগের কয়েকটি অসম্পূর্ণ বাক্য।

স্পেন আর ফিরতে পারেনি।

শেষ বাঁশি বাজল। খেলোয়াড়েরা মাঠ ছাড়লেন। গ্যালারি ফাঁকা হয়ে গেল। ভিলা পার্কের ঘাসে পড়ে থাকল বৃষ্টির জল আর একটি ম্যাচের স্মৃতি।

সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা গ্রুপপর্ব পেরিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। সেখানে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হেরে থেমে যায়।

[বিদেশি পত্র পত্রিকা অবলম্বনে]

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...