বন্দিশালার অন্ধকার থেকে বিশ্বকাপের আলোয়

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

প্রিয় পাঠক,
শৈশবের অনেক স্মৃতি মানুষ ভুলে যায়। কিন্তু কিছু গল্প রক্তের ভেতর বাসা বাঁধে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকে।

গ্রানিত জাকার জীবনও তেমন এক গল্প।

সুইজারল্যান্ডের জার্সি গায়ে যখন তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে নামেন, তখন অনেকেই দেখেন একজন অভিজ্ঞ মিডফিল্ডারকে। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, তার যাত্রা শুরু হয়েছিল যুদ্ধ, ভয় আর নির্বাসনের ইতিহাস থেকে।

জাকার বাবা রাগিপ জাকা ছিলেন কসোভোর একজন আলবেনীয়। যুগোস্লাভিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তিনি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। বছরের পর বছর কারাগারে কাটাতে হয় তাকে। পরিবারের কাছে সেই সময়টি ছিল অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর অপেক্ষার।

কারামুক্তির পরও শান্তি ফেরেনি। পরিবার বুঝতে পারে, সেখানে ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়। তাই তারা নতুন জীবনের আশায় পাড়ি জমান সুইজারল্যান্ডে।

সেই দেশেই জন্ম নেন গ্রানিত জাকা।

শৈশবে তিনি বাবার মুখে বারবার শুনেছেন কারাগারের গল্প, স্বাধীনতার গল্প, নিজের পরিচয় হারিয়ে না ফেলার গল্প। বাবা তাকে শিখিয়েছিলেন—মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রতিশোধ নয়, নিজের যোগ্যতা দিয়ে সম্মান অর্জন করা।

জাকার ফুটবল জীবন তাই শুধু প্রতিভার গল্প নয়; এটি এক শরণার্থী পরিবারের নতুন করে দাঁড়িয়ে ওঠার গল্পও।

বাড়িতে আলবেনীয় ভাষা, বাইরে জার্মান। ঘরের ভেতর কসোভোর স্মৃতি, মাঠে সুইজারল্যান্ডের পতাকা। দুটি পরিচয়কে একসঙ্গে বুকে ধারণ করেই বড় হয়েছেন তিনি।

অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, কেন তিনি সুইজারল্যান্ডের হয়ে খেলেন? জাকার উত্তর ছিল সহজ—এই দেশ তাকে নিরাপদ শৈশব দিয়েছে, স্বপ্ন দেখার সুযোগ দিয়েছে। আর নিজের শিকড়? সেটি কখনও অস্বীকার করেননি। বরং প্রতিটি সাফল্যের সঙ্গে কসোভোর কথাও তিনি স্মরণ করেছেন।

বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে যখন তিনি অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামেন, তখন সেটি শুধু একটি দলের নেতৃত্ব নয়। সেটি যেন হাজারো উদ্বাস্তু পরিবারের পক্ষ থেকে একটি নীরব ঘোষণা—ভাগ্য মানুষকে ঘরছাড়া করতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারে না।

ফুটবলে গোলের হিসাব থাকে, ট্রফির হিসাব থাকে। কিন্তু মানুষের সংগ্রামের কোনো পরিসংখ্যান হয় না।

গ্রানিত জাকার গল্প সেই অদৃশ্য হিসাবের গল্প। যেখানে একটি পরিবারের অন্ধকার কারাকক্ষের স্মৃতি একদিন পৌঁছে যায় বিশ্বকাপের উজ্জ্বল আলোয়।

হয়তো এ কারণেই জাকাকে দেখলে মনে হয়, তিনি শুধু বল নিয়ন্ত্রণ করেন না; নিজের পরিবারের ইতিহাসও বয়ে নিয়ে চলেন। আর প্রতিটি পাস, প্রতিটি লড়াই যেন বলে—কোনো বন্দিশালাই মানুষের স্বপ্নকে চিরদিন আটকে রাখতে পারে না।

[বিদেশি পত্র পত্রিকা অবলম্বনে]

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...