
রিয়াজ রহমান, শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বাজারগুলোতে দিন দিন বাড়ছে কোণা পোড়া ও ক্ষতিগ্রস্ত কাগুজে নোটের ব্যবহার। সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে ১০ ও ২০ টাকার নোট। তবে মাঝেমধ্যে ৫০, ৫০০ এমনকি ১ হাজার টাকার কোণা পোড়া নোটও হাতবদল হচ্ছে। এসব নোট নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন অনেক ক্রেতা ও ব্যবসায়ী। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী বিনিময়যোগ্য টেপ লাগানো বা সঠিকভাবে জোড়া দেওয়া নোটও অনেকেই ফিরিয়ে দিচ্ছেন। ফলে প্রতিদিনই সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা পড়ছেন অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনায়।
সরেজমিনে শিবচর বাজার,পাঁচ্চর বাজার বাজার, চান্দেরচর বাজার ও উপজেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার ঘুরে এবং ব্যবসায়ী-ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত নোট নিয়ে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। অনেক সময় ক্রেতার কাছে বিকল্প টাকা না থাকায় ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে কোণা পোড়া নোট গ্রহণ করেন। কিন্তু পরে সেই নোট অন্যের কাছে দিলে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এতে একদিকে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও বাড়ছে।
শিবচর বাজারের মুদি ব্যবসায়ী বকুল সাহা বলেন, “দিন শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখা যায় ক্যাশবাক্সে কয়েকটি কোণা পোড়া নোট জমেছে। ক্রেতার কাছ থেকে নিতে বাধ্য হলেও পরে সেই নোট দিয়ে আর লেনদেন করা যায় না। শেষ পর্যন্ত ক্ষতির বোঝা ব্যবসায়ীকেই বহন করতে হয়।”
ক্লিনিক ব্যবসায়ী নুরুল আমিন বলেন, “অনেক রোগী বা তাদের স্বজন না বুঝেই ক্ষতিগ্রস্ত নোট দিয়ে যান। পরে সেই নোট নিয়ে ব্যাংক বা অন্য প্রতিষ্ঠানে গেলে নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। সাধারণ মানুষ এখনো জানেন না কোন নোট গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়।”
ঔষধ ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেন বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম সম্পর্কে সচেতনতার অভাবই সবচেয়ে বড় সমস্যা। অনেক সময় টেপ লাগানো বৈধ নোটও মানুষ নিতে চান না। এতে প্রতিদিন অকারণে তর্ক-বিতর্ক ও ঝামেলা সৃষ্টি হচ্ছে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো নোট ছিঁড়ে গেলে সেটি সঠিকভাবে জোড়া লাগানো থাকলে এবং সিরিয়াল নম্বর, নিরাপত্তা সুতা, জলছাপসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য অক্ষত থাকলে সেটি বিনিময়যোগ্য। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়ম সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষের ধারণা না থাকায় গ্রহণযোগ্য নোটও বাজারে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াবা ও হেরোইনসহ কিছু মাদক সেবনের সময় কাগুজে নোট ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আগুনের সংস্পর্শে এসে কিছু নোটের কোণা পুড়ে যায় এবং পরে সেগুলো বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বাজারে থাকা সব কোণা পোড়া নোট একই কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত নোট দ্রুত বাজার থেকে তুলে নতুন নোট ছাপাতে রাষ্ট্রকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে শুধু সরকারি ব্যয়ই বাড়ে না, মুদ্রা ব্যবস্থাপনাও চাপে পড়ে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত নোটের ব্যবহার কমাতে যেমন জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন, তেমনি মাদক নিয়ন্ত্রণেও আরও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা বলেন, “শিবচরে কেউ মাদক কারবারির তথ্য দিয়ে তাকে ধরিয়ে দিতে সহযোগিতা করলে আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে নগদ অর্থ দিয়ে পুরস্কৃত করব। মাদকমুক্ত শিবচর গড়ে তুলতে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও কঠোর অবস্থানে থাকব। প্রশাসনের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।”
শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন বলেন, “মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করা হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত নোট নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা ব্যাপকভাবে প্রচার করা জরুরি। একই সঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে কোণা পোড়া নোটের বিস্তারও কমে আসবে। এতে লেনদেন সহজ হবে এবং সাধারণ মানুষের অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তিও অনেকাংশে কমবে।





