
আলী কদর পলাশ
প্রিয় পাঠক,
ছেলেটির তখন কিছু বোঝার বয়স হয়নি।
সে শুধু দেখত, বাবা আর আগের মতো মাঠে যান না। বুটজোড়া পড়ে থাকে ঘরের এক পাশে। জার্সি থাকে আলমারিতে। যে মানুষটিকে একসময় হাজারো দর্শকের সামনে ছুটতে দেখা যেত, তিনি এখন বাড়ির উঠোনে ছোট্ট ছেলের সঙ্গে বল গড়িয়ে দেন।
ছেলেটি জানত না, এই নীরবতার পেছনে আছে ফুটবলের এক পুরোনো ক্ষত।
ইংল্যান্ডের এক ফুটবল মাঠে একদিন ঘটে গিয়েছিল সেই ঘটনা। দুজন ফুটবলার। পুরোনো রাগ। পুরোনো অপমান। খেলার শেষ দিকে হঠাৎ এল আঘাত। বল ছিল একদিকে, মানুষের শরীর ছিল আরেকদিকে। একজন মাটিতে পড়ে রইলেন। অন্যজন লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লেন।
ঘটনাটি সেদিনই শেষ হয়নি।
কারণ যিনি আঘাত করেছিলেন, তিনি ছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিখ্যাত অধিনায়ক রয় কিন। আর যিনি মাটিতে পড়েছিলেন, তিনি ছিলেন নরওয়ের ফুটবলার আলফ-ইঙ্গে হালান্ড।
এই দুই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৯৭ সালের আরেক ঘটনা। তখন আলফ-ইঙ্গে খেলতেন লিডস ইউনাইটেডে। এক ম্যাচে বল দখলের লড়াইয়ে রয় কিন নিজেই হাঁটুতে বড় চোট পান। ব্যথায় তিনি মাটিতে পড়ে থাকলে আলফ-ইঙ্গে ভেবেছিলেন, তিনি অভিনয় করছেন। কথাও বলেছিলেন তেমনই। সেই অপমান রয় কিন ভুলতে পারেননি।
চার বছর পর ২০০১ সালের ম্যানচেস্টার ডার্বিতে তিনি যেন সেই রাগেরই হিসাব চুকিয়েছিলেন।
অনেকদিন বলা হয়েছে, সেই আঘাতেই আলফ-ইঙ্গের ফুটবল জীবন শেষ হয়ে যায়। পুরো সত্যটি অবশ্য একটু আলাদা। পরে তাঁর শরীরের অন্য সমস্যাও সামনে আসে। হাঁটুর জটিলতা বাড়ে। তাই একমাত্র সেই আঘাতই তাঁর অবসরের কারণ—এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু এটুকু সত্য, সেই ঘটনার পর তিনি আর আগের মতো মাঠে ফিরতে পারেননি।
মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে এক লড়াকু ফুটবলারের পথ থেমে যায়।
তারপরও মানুষ থেমে থাকে না। মানুষ তার স্বপ্নকে এক শরীর থেকে আরেক শরীরে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে দেয়। ইতিহাস এভাবেই তৈরি হয়। মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই। নহে কিছু মহীয়ান।
ঘরের ভেতর যে ছোট্ট ছেলে বাবার পাশে বল নিয়ে খেলত, সে বড় হতে থাকে। তার পায়ে জমতে থাকে অদ্ভুত শক্তি। চোখে আসে গোলের ক্ষুধা। শরীরে আসে গতির ঝড়। নাম তার আরলিং হালান্ড।
বাবা যে ক্লাবে একদিন কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেই ম্যানচেস্টার সিটির জার্সিই একদিন পরে ছেলে। তারপর শুরু হয় গোলের পর গোল। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে যায়। মাঠে দাঁড়িয়ে মনে হয়, যেন বহু বছর আগের নীরবতার উত্তর লিখছে এক নতুন প্রজন্ম।
আজ ব্রাজিলকে হারিয়ে নরওয়ের জয়ের নায়ক সেই ছোট্ট আরলিং হালান্ড। বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে তাঁর গোলই যেন পুরোনো গল্পটিকে নতুন আলোয় ফিরিয়ে এনেছে। একদিন বাবার স্বপ্ন থেমে গিয়েছিল আঘাতে। আজ ছেলের পায়ে সেই স্বপ্ন এগিয়ে যাচ্ছে জয়ের পথে।
অনেকে বলেন, এ ছিল প্রতিশোধ।
কিন্তু আরলিং হালান্ড কখনো প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলেননি। তিনি কাউকে আঘাত করেননি। পুরোনো রাগের বদলা নিতে কারও পায়ে বুট তোলেননি। তিনি শুধু গোল করেছেন। জিতেছেন। বাবার হারানো স্বপ্নকে নিজের সাফল্যের ভেতর দিয়ে নতুন জীবন দিয়েছেন।
ফুটবলে এটাই হয়তো সবচেয়ে সুন্দর জবাব।
যেখানে রাগ নেই, আঘাত নেই, কেবল খেলা আছে। কেবল জয় আছে। কেবল এক বাবার চোখে ছেলের জন্য নীরব গর্ব আছে।
আলফ-ইঙ্গে হালান্ডের ক্যারিয়ার অসমাপ্ত থেকে গিয়েছিল। কিন্তু সেই অসমাপ্ত গল্প একদিন শেষ করেছে তাঁর ছেলে।
বাবা মাঠ থেকে সরে গিয়েছিলেন আঘাত নিয়ে। ছেলে মাঠে দাঁড়িয়েছে গোল নিয়ে।
এই কারণেই ফুটবল শুধু খেলা নয়। কখনো কখনো এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে যাওয়া স্বপ্নের নাম।
[বিদেশি পত্র পত্রিকা অবলম্বনে]





