
আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ), রংপুর ব্যুরো
দেশের উত্তরাঞ্চলের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান—একসময় যে নামটি উচ্চারিত হয়েছিল বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় জ্বালানি সম্পদের নতুন দিগন্ত হিসেবে, আজ সেটিই তিন যুগের বেশি সময় ধরে এক অমীমাংসিত রহস্যের প্রতীক। ১৯৮০-এর দশকে আবিষ্কৃত শালবাহান তেল খনি নিয়ে নতুন করে সরব হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, সচেতন নাগরিক ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা। তাদের অভিযোগ, বিপুল সম্ভাবনার এই তেল খনি আবিষ্কারের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুসন্ধান, বাজেট বরাদ্দ, জমি অধিগ্রহণ, কূপ খনন এমনকি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন পর্যন্ত হলেও রহস্যজনকভাবে তা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর কেটে গেছে ৩৭ বছর। কিন্তু কেন এই খনি বন্ধ করা হয়েছিল, সেখানে সত্যিই তেল বা গ্যাসের মজুদ ছিল কি না, আর থাকলে কেন তা উত্তোলনের উদ্যোগ আর নেওয়া হলো না—এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর আজও পায়নি পঞ্চগড়বাসী।
এই বাস্তবতায় শালবাহান তেল খনি পুনরায় চালু, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন জরিপ পরিচালনা, খনি বন্ধের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবিতে পঞ্চগড়ে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি কেবল একটি খনি পুনরুদ্ধারের দাবি নয়; বরং বহু বছর ধরে ধামাচাপা পড়ে থাকা একটি জাতীয় সম্পদের সত্য উদ্ঘাটনের আন্দোলন।
গত ১১ মে সোমবার দুপুরে পঞ্চগড় শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে সচেতন নাগরিক কমিটি আয়োজিত এ মানববন্ধনে বিভিন্ন সামাজিক, পরিবেশবাদী, স্বেচ্ছাসেবী ও নাগরিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সচেতন নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মনোয়ার হোসেন হানিফ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন পঞ্চগড়ের সভাপতি আনোয়ারুল খায়ের, সম্মিলিত স্বেচ্ছাসেবী ফোরামের যুগ্ম সমন্বয়ক মানিক খান, সাংবাদিক এম এ বাসেদ, সোহরাব আলীসহ রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। বক্তারা এক কণ্ঠে বলেন, শালবাহান তেল খনির ইতিহাস কেবল একটি খনির ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, অনুসন্ধান, সম্ভাবনা, ধোঁয়াশা ও দীর্ঘ নীরবতার ইতিহাস। আর সেই নীরবতা ভাঙতেই আজ রাস্তায় নেমেছেন পঞ্চগড়ের মানুষ।
## ৮০–র দশকে আলোড়ন তোলা আবিষ্কার
মানববন্ধনে বক্তারা শালবাহান তেল খনির ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ১৯৮৬-৮৭ সালে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বাংলাদেশ সেল এবং সিঙ্গাপুর ও কোরিয়ার যৌথ অনুসন্ধান ও সমীক্ষার পর বাংলাদেশ খনিজ মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান ইউনিয়নের শালবাহান এলাকায় মাটির নিচে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, বিশেষ করে কেরোসিনজাত জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে। সে সময় এটিকে বাংলাদেশের প্রথম তেল খনিজ মজুদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।
প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে আসার পর শালবাহানকে ঘিরে শুধু পঞ্চগড়েই নয়, গোটা দেশেই এক ধরনের আশাবাদ সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, উত্তরবঙ্গের একটি প্রত্যন্ত জনপদ হঠাৎ করেই জাতীয় জ্বালানি সম্ভাবনার মানচিত্রে জায়গা করে নেয়। পঞ্চগড়ের মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেন, এই তেল খনি শুধু তাদের জেলার নয়, গোটা দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
## রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, বাজেট বরাদ্দ, জমি অধিগ্রহণ
বক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে শালবাহান কূপ থেকে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। পেট্রোলিয়াম ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় নতুন করে অনুসন্ধান চালানো হয়। তখন শালবাহান এলাকায় প্রায় ৫ হাজার পয়েন্ট গভীরে খনিজ সম্পদের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তীতে ফরাসি কোম্পানি ফরাসল টানা দুই বছর অনুসন্ধান শেষে নিশ্চিত হয় যে, তেঁতুলিয়া এলাকায় প্রায় ৯০০ মিটার গভীরে উত্তোলনযোগ্য জ্বালানি তেলের স্তর রয়েছে।
এরপর ১৯৮৮ সালে কূপ খননের জন্য বাংলাদেশ সেল পেট্রোলিয়াম কোম্পানি এবং ফরাসি কোম্পানি ফরাসলের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তেল উত্তোলন কার্যক্রমকে সামনে রেখে ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকার এ প্রকল্পের জন্য ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। শুধু কাগুজে পরিকল্পনা নয়, বাস্তব প্রস্তুতিও শুরু হয়। সরকার শালবাহান তেল খনি এলাকায় প্রায় ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করে। সরকারি তত্ত্বাবধানে বিদেশি কোম্পানির যন্ত্রপাতি, ভারী যানবাহন ও বিশেষজ্ঞ দল সেখানে প্রবেশ করে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও কূপ খননের কাজ চলতে থাকে জোরেশোরে। একপর্যায়ে প্রায় ৯৯ ভাগ নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল যে, শালবাহানে তেল ও গ্যাসের উল্লেখযোগ্য মজুদ রয়েছে।
## ৮ হাজার ফুট গভীরে কূপ, রাষ্ট্রপতির উদ্বোধন
বক্তারা জানান, শালবাহানে প্রায় ৮ হাজার ফুট গভীরে ১২ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের একটি কূপ খনন করা হয়। তেল প্রাপ্তির বিষয়টি সুনিশ্চিত হয়েছে—এমন ধারণা থেকেই ১৯৮৮ সালের ১০ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজে শালবাহানে এসে তেল খনির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। সে সময় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দ্রুত তেল উত্তোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়। উদ্বোধনের এই ঘটনাকে স্থানীয়রা আজও স্মরণ করেন শালবাহানের সবচেয়ে গৌরবময় মুহূর্ত হিসেবে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, “যে খনির উদ্বোধন করতে রাষ্ট্রপতি নিজে শালবাহানে এসেছিলেন, যে খনির জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল, যে প্রকল্পে বিদেশি কোম্পানি, যন্ত্রপাতি, জমি অধিগ্রহণ, কূপ খনন—সবকিছুই সম্পন্ন হয়েছিল, সেই খনি হঠাৎ কীভাবে ‘অলাভজনক’ বা ‘তেলশূন্য’ হয়ে গেল—এ প্রশ্নের উত্তর জনগণ জানতে চায়।”
## আনন্দের পরপরই রহস্যের শুরু
শালবাহান তেল খনির ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় শুরু হয় উদ্বোধনের অল্প কিছুদিন পরই। স্থানীয়দের দাবি, আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যেই ভারতীয় একটি হেলিকপ্টার এসে খনি এলাকার ওপর তিনবার চক্কর দিয়ে চলে যায়। এরপর হঠাৎ করেই ফরাসি কোম্পানি ফরাসল ঘোষণা দেয়—এই এলাকায় আর তেল নেই। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই ঘোষণার পরপরই তারা টানা তিনদিন ধরে খনির মূল পয়েন্টে সিমেন্ট ও সিসা ঢেলে কূপের মুখ সিলগালা করে দেয়। ফলশ্রুতিতে শালবাহান কূপে তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সব কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কিছুদিনের মধ্যেই বিদেশি কোম্পানি তাদের সরঞ্জাম গুটিয়ে নেয় এবং কর্মচারীরাও এলাকা ত্যাগ করে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পঞ্চগড়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন, ক্ষোভ ও সন্দেহ ঘুরপাক খাচ্ছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, একটি সম্ভাবনাময় খনিকে রহস্যজনকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আবার অনেকে মনে করেন, রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক কোনো চাপের কারণেই তৎকালীন প্রকল্পটি থামিয়ে দেওয়া হয়। তবে এ নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা কখনোই দেওয়া হয়নি।
## ‘খনি বন্ধের পেছনে কী ছিল?’—প্রশ্নের উত্তর চায় স্থানীয়রা
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, শালবাহান তেল খনি পরিত্যক্ত ঘোষণার কারণ নিয়ে বহু বছর ধরেই নানা ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সে সময়ের সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে খনি বন্ধের পেছনে দুটি সম্ভাব্য কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল—একটি রাজনৈতিক চাপ, অন্যটি ভারতীয় স্বার্থ। যদিও এসব দাবি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। অন্যদিকে পেট্রোবাংলার ভাষ্য ছিল, শালবাহান থেকে তেল উত্তোলন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয় বলেই বিদেশি কোম্পানিগুলো এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে।
তবে বক্তারা প্রশ্ন তোলেন, “একটি খনিতে যদি সত্যিই কোনো সম্ভাবনা না-ই থাকে, তবে কেন সেখানে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হলো? কেন ভূমি অধিগ্রহণ হলো? কেন বিদেশি বিশেষজ্ঞ দিয়ে দীর্ঘদিন অনুসন্ধান চালানো হলো? আর কেনই বা রাষ্ট্রপতি নিজে গিয়ে উদ্বোধন করলেন?”
বক্তারা আরও বলেন, “পঞ্চগড়ের মানুষ কোনো গুজব নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত সত্য জানতে চায়। শালবাহানে তেল ছিল কি ছিল না—এ প্রশ্নের জবাব আধুনিক প্রযুক্তি দিয়েই বের করা সম্ভব। ৩৭ বছর ধরে ধোঁয়াশা রেখে জাতীয় সম্পদকে বিস্মৃত করে রাখা চলতে পারে না।”
## ‘ভারত সীমান্তের কাছে তেল কূপ, কিন্তু শালবাহান নীরব’
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কয়েকজন বক্তা দাবি করেন, শালবাহান থেকে খুব বেশি দূরে নয়—ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার একটি এলাকায় পরবর্তীতে তেল কূপ খননের খবরও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। যদিও এসব বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তাদের দাবি, সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গঠন, তেল-গ্যাসের সম্ভাবনা এবং অতীত অনুসন্ধান—সবকিছু নতুনভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। তারা বলেন, যদি প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডে একই ভূতাত্ত্বিক বেল্টে অনুসন্ধান ও উত্তোলনের উদ্যোগ থাকতে পারে, তাহলে শালবাহানকে আর অবহেলায় ফেলে রাখা যায় না।
## মানববন্ধনে বক্তাদের জোরালো বক্তব্য
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, শালবাহান তেল খনি নিয়ে এখন আর আবেগ বা ইতিহাসচর্চা নয়, দরকার বাস্তবমুখী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। তাদের মতে, দেশের জ্বালানি খাতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, আমদানিনির্ভরতার কারণে যে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে, সেই প্রেক্ষাপটে দেশের ভেতরে থাকা সম্ভাবনাময় যেকোনো খনিজ সম্পদ নতুন করে মূল্যায়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সচেতন নাগরিক কমিটির নেতারা বলেন, “শালবাহান তেল খনি শুধু পঞ্চগড়ের নয়, এটি বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদের বিষয়ে অস্পষ্টতা রেখে দেওয়া মানে দেশের মানুষের কাছ থেকে সত্য গোপন রাখা। আমরা চাই—এই খনি নিয়ে যেসব পুরোনো রিপোর্ট আছে, যেসব নথি আছে, যেসব প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন আছে, সব জনসম্মুখে আনা হোক।”
বক্তারা আরও বলেন, “যদি আগের অনুসন্ধান ভুল হয়ে থাকে, তাহলে নতুন জরিপে তা প্রমাণ হোক। আর যদি সত্যিই সেখানে তেল বা গ্যাসের বাণিজ্যিক মজুদ থাকে, তাহলে তা দ্রুত উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হোক। কিন্তু ধোঁয়াশা আর নীরবতার মধ্যে একটি জাতীয় সম্পদকে ফেলে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
তাদের ভাষ্য, “দেশে যখন জ্বালানি সংকট চলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে, সরকারকে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে—তখন শালবাহানের মতো সম্ভাবনাময় একটি খনি নতুন করে যাচাই না করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের শামিল।”
## ‘আধুনিক প্রযুক্তিতে জরিপ হোক, উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক’। মানববন্ধন থেকে বক্তারা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেন। তাদের দাবি—
* শালবাহান তেল খনি এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুনরায় ভূতাত্ত্বিক ও ভূ-ভৌতিক জরিপ পরিচালনা করতে হবে।
* অতীতের সব অনুসন্ধান প্রতিবেদন, কূপ খননের তথ্য, বিদেশি কোম্পানির রিপোর্ট ও সরকারি নথি পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
* দেশি-বিদেশি জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, ভূতত্ত্ববিদ ও প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করতে হবে।
* শালবাহান তেল খনি কেন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল, তা অনুসন্ধানে প্রয়োজন হলে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
* যদি সেখানে তেল বা গ্যাসের বাণিজ্যিক মজুদ পাওয়া যায়, তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে উত্তোলনের রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে।
* জাতীয় সম্পদ রক্ষায় শালবাহানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বক্তারা বলেন, “আমরা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান দিতে আসিনি। আমরা আমাদের জেলার মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা একটি সম্ভাব্য জাতীয় সম্পদের ন্যায়সঙ্গত হিসাব চাই। আমরা চাই সরকার সত্য উদ্ঘাটন করুক, নতুন জরিপ করুক, জনগণকে জানাক—শালবাহানের ভেতরে আসলে কী আছে।”
## ‘শালবাহান শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, ভবিষ্যতেরও সম্ভাবনা’
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয়দের ভাষ্য, শালবাহান তেল খনি নিয়ে তাদের আগ্রহের পেছনে শুধু আবেগ নয়, রয়েছে বাস্তব অর্থনৈতিক চিন্তাও। তারা মনে করেন, যদি এই খনিতে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য তেল বা গ্যাসের মজুদ থাকে, তাহলে তা দেশের জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। একই সঙ্গে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্পায়নেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বক্তারা বলেন, “পঞ্চগড়ের মানুষ একসময় স্বপ্ন দেখেছিল, শালবাহানের তেল দেশের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন হঠাৎ থেমে যায়। আজ আমরা আবার সেই স্বপ্নকে রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনতে চাই। আমরা চাই, শালবাহানকে নতুনভাবে দেখা হোক—গুজবের জায়গা থেকে নয়, বিজ্ঞান, তথ্য ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির জায়গা থেকে।”
## স্মারকলিপি দিলেন আন্দোলনকারীরা
একই দাবিতে মানববন্ধন শেষে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও মন্ত্রী বরাবর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়। স্মারকলিপিতে শালবাহান তেল খনির অতীত অনুসন্ধান কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ, আধুনিক প্রযুক্তিতে নতুন জরিপ, বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন, খনি বন্ধের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
আন্দোলনকারীরা বলেন, শুধু মানববন্ধন বা স্মারকলিপিতে তারা থেমে থাকবেন না। প্রয়োজন হলে বৃহত্তর নাগরিক আন্দোলন, গণস্বাক্ষর কর্মসূচি, সেমিনার, জনমত গঠন এবং জাতীয় পর্যায়ে বিষয়টি তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাদের ভাষায়, “শালবাহান তেল খনির প্রশ্নে আমরা আর নীরব থাকব না। সত্য উদ্ঘাটন না হওয়া পর্যন্ত আমরা দাবি জানিয়ে যাব।”
## স্থানীয়দের ক্ষোভ ‘৩৭ বছরেও কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই’
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয়দের অনেকেই বলেন, শালবাহান তেল খনিকে ঘিরে তাদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি রয়েছে। তারা দেখেছেন কীভাবে একসময় এলাকায় বিদেশি কোম্পানির গাড়ি, যন্ত্রপাতি, কূপ খননের কাজ এবং সরকারি তৎপরতা ছিল। আবার হঠাৎ করেই সব থেমে যায়। এরপর বছরের পর বছর কেটে গেলেও কোনো সরকারই এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। স্থানীয়দের ভাষায়, এই নীরবতা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি পঞ্চগড়বাসীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনার প্রতীকও।
তাদের অভিযোগ, উত্তরাঞ্চলের অনেক সম্ভাবনাময় প্রকল্পের মতো শালবাহানও অবহেলা, উদাসীনতা ও অদৃশ্য চাপের শিকার হয়েছে। তাই তারা এখন চান, কেন্দ্রীয় সরকার বিষয়টিকে কেবল স্থানীয় দাবি হিসেবে না দেখে জাতীয় জ্বালানি নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করুক।
## পদ্মা অয়েল ও জেলা প্রশাসনের বক্তব্য
বিপিসির অধীনস্থ রংপুর অঞ্চলের প্রধান তৈলাধার পদ্মা অয়েল পিএলসি (রংপুর ডিপো)–এর কর্মকর্তা মো. আমিনুর রহমান (অপারেশন্স) এ বিষয়ে বলেন, “শালবাহান তেল খনির বিষয়টি দীর্ঘদিনের পুরোনো একটি বিষয়। এটি মূলত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং অনুসন্ধান সংস্থাগুলোর দেখভালের বিষয়। স্থানীয়দের দাবির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সরকার বা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি এ বিষয়ে নতুন করে কোনো জরিপ, অনুসন্ধান বা মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয়, তাহলে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আমরা সহযোগিতা করব।”
পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মোছা. শুকরিয়া পারভীন বলেন, “শালবাহান তেল খনি নিয়ে স্থানীয়দের যে দাবি ও আগ্রহ রয়েছে, বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। মানববন্ধন থেকে দেওয়া স্মারকলিপি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নেবে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।”
## নতুন করে আলোচনায় শালবাহান, প্রত্যাশা বাস্তব উদ্যোগের
দেশে জ্বালানি খাতে চলমান সংকট, আমদানিনির্ভরতার চাপ, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা এবং জাতীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনার মধ্যে শালবাহান তেল খনির বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। পঞ্চগড়ের মানুষের প্রত্যাশা, এত বছরের ধোঁয়াশা দূর করে সরকার যদি এখনই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জরিপ, তথ্য-উপাত্তের স্বচ্ছ মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের পথে হাঁটে, তাহলে শালবাহান শুধু অতীতের এক রহস্য হয়েই থাকবে না—বরং দেশের জ্বালানি ভবিষ্যতের একটি বাস্তব সম্ভাবনায় পরিণত হতে পারে।
স্থানীয়দের ভাষায়, “আমরা কোনো কল্পকাহিনি চাই না, চাই সত্য। শালবাহানে যদি তেল না থাকে, সেটাও সরকার বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে জানাক। আর যদি থাকে, তাহলে দেশের স্বার্থে তা উত্তোলনের উদ্যোগ নিক। কিন্তু আর কোনোভাবেই শালবাহানকে ধোঁয়াশা, গুজব আর অবহেলার অন্ধকারে ফেলে রাখা যাবে না।”





