
আলী কদর পলাশ
মক্কা ও মদিনা মুসলমানের হৃদয়ের পবিত্রতম স্থান। এই দুই নগরীর প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা গভীর, আন্তরিক এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু পবিত্র ভূমির প্রতি শ্রদ্ধা আর সেই দেশের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা এক কথা নয়। সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা আমাদের সেই পার্থক্যটি নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে। ধর্মীয় আবেগের কারণে কোনো রাষ্ট্রকে জবাবদিহির বাইরে রাখা যায় না। বরং যে ধর্ম ন্যায়বিচার ও মানুষের মর্যাদার শিক্ষা দেয়, তার পবিত্রতম ভূমির শাসকদের কাছে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাও বেশি।
১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার নামে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছিল। সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো বন্দিদের তালিকায় নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ এবং সুইটি আক্তারের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ উল্লেখ থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ বিচারিক ভিত্তি ও রায়ের বিবরণ স্পষ্ট হয়নি। অভিযোগের গুরুত্ব যত বেশি, স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনও তত বেশি। অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী শাস্তি হতে পারে। আমাদের প্রশ্ন শাস্তির বিধান নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, অভিযুক্তরা যথাযথ আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, তাঁদের বিচার সম্পর্কে বাংলাদেশকে কী জানানো হয়েছিল এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কূটনৈতিক যোগাযোগে এত বড় ঘাটতি কেন রয়ে গেল।

২১ অক্টোবর মানবজমিনে প্রকাশিত আব্দুল কাইয়ুমের প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ কনস্যুলেটে বন্দিদের যে তালিকা পাঠিয়েছিল, তাতে দুজনের নাম ও অভিযোগের উল্লেখ ছিল। অথচ মৃত্যুদণ্ডের তথ্য ছিল না। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাঁদের ২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এত দীর্ঘ সময় বিচারপ্রক্রিয়া চলার পরও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মিশন কেন মামলার প্রকৃত অবস্থা জানতে পারল না, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ১৯ অক্টোবর ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানে কেন ঘাটতি ছিল, সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
সৌদি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একজন বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির বিচার চললে তাঁর দেশের কনস্যুলার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বাংলাদেশের মিশনও শুধু বন্দিদের নামের তালিকা সংগ্রহ করে দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। গুরুতর অভিযোগে আটক নাগরিকের মামলার অগ্রগতি, আইনজীবীর সহায়তা, দোভাষীর ব্যবস্থা এবং আপিলের সুযোগ সম্পর্কে খোঁজ রাখা প্রয়োজন। পরিবার যোগাযোগ করেনি, এমন যুক্তি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের বিকল্প হতে পারে না।
এ ঘটনার আরও বেদনাদায়ক দিক হলো, পরিবারের সদস্যরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জেনেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একটি পরিবার তার স্বজনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে আগাম কিছুই জানতে পারবে না, অথচ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকবে, এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। বাংলাদেশের নাগরিক বিদেশে অপরাধের অভিযোগে আটক হতে পারেন। কিন্তু সে কারণে তাঁর নাগরিক অধিকার বা রাষ্ট্রের কাছে ন্যূনতম সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশা বিলুপ্ত হয় না।
এই দুই মৃত্যুর ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখারও সুযোগ নেই। সৌদি আরবে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক পুরুষ ও নারী কর্মী কাজ করেন। তাঁদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। অথচ বছরের পর বছর নারী গৃহকর্মীদের নির্যাতন, বেতন না পাওয়া, চলাচলে বাধা, যৌন সহিংসতা এবং নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও সৌদি আরবের গৃহকর্মীদের সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
বিশেষ করে নারী কর্মীদের অভিজ্ঞতা আমাদের গভীরভাবে ভাবায়। জীবিকার আশায় বিদেশে যাওয়া একজন নারী যখন নিয়োগকর্তার বাড়িতে নির্যাতনের শিকার হন, তখন তাঁর পক্ষে সাহায্য চাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ভাষার প্রতিবন্ধকতা, নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরতা, পাসপোর্ট আটকে রাখা কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব তাঁকে আরও অসহায় করে তুলতে পারে। কেউ নির্যাতন সহ্য করে কাজ চালিয়ে যান, কেউ দেশে ফিরে আসেন, আবার মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। যৌন সহিংসতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটির যথাযথ তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত নারীর মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা জরুরি।
এখানে বাংলাদেশের দায়ও কম নয়। নারী কর্মী পাঠানোর আগে নিয়োগকর্তা যাচাই, চুক্তির শর্ত নিশ্চিত করা, কর্মীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং অভিযোগ পেলে দ্রুত উদ্ধার ও আইনি সহায়তার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা খতিয়ে দেখতে হবে। শুধু বিদেশে কর্মসংস্থানের সংখ্যা বাড়ানোকে সাফল্য বলা যায় না। কর্মীর নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি এবং মর্যাদা নিশ্চিত করাই প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ক ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেই সম্পর্ক রক্ষা করতেই সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন। বন্ধুত্বের অর্থ নীরব সম্মতি নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তি হলো দুই দেশের নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া। বাংলাদেশের লাখ লাখ শ্রমিক সৌদি অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। তাঁদের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ও মানবিক দায়িত্ব।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত অনুসন্ধানে সৌদি আরবে কর্মরত ৭০ জনের বেশি কেনীয় নারী গৃহকর্মীর অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ হয়েছে। তাঁদের সাক্ষ্যে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বেতন আটকে রাখা, চলাচলে বাধা এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত আরেকটি অনুসন্ধানে ১৯ জন ফিলিপিনো নারী গৃহকর্মীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। সেখানেও শোষণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন সংস্থা এসব অভিযোগের তদন্ত এবং গৃহকর্মীদের সমান আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। এগুলো শুধু বাংলাদেশের অভিযোগ নয়। বিভিন্ন দেশের নারীদের অভিজ্ঞতায় একই ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে।
বাংলাদেশি পুরুষ শ্রমিকদের অবস্থাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ২০২৫ সালের নভেম্বরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে রিয়াদ মেট্রো প্রকল্পে কর্মরত বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের শ্রমিকদের অতিরিক্ত নিয়োগব্যয়, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং অনিরাপদ পরিবেশের অভিযোগ উঠে আসে। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল নারী কর্মীদের নয়। অভিবাসী শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় আরও বিস্তৃত পরিবর্তন প্রয়োজন।
সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীদের যৌন নির্যাতন ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের অভিযোগ শুধু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কেনিয়ার এমন পাঁচ নারীর দুর্দশা তুলে ধরেছে, যাঁরা সৌদি আরবে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর প্রয়োজনীয় নথি ও বহির্গমনসংক্রান্ত জটিলতায় আটকে পড়েছেন। তাঁদের কারও অভিজ্ঞতায় যৌন হয়রানির অভিযোগও উঠে এসেছে। তবে সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রতিটি ঘটনাকে যৌন নির্যাতনের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই। একইভাবে সৌদি আরব থেকে প্রত্যাগত নারীদের অধিকাংশই গর্ভবতী হয়ে ফেরেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য সামগ্রিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। এই তথ্যের অভাব নির্যাতনের অভিযোগকে খাটো করে না। বরং স্বাধীন তদন্ত, নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান এবং ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য ন্যায়বিচারের প্রয়োজন আরও স্পষ্ট করে।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় এখন প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট জবাবদিহি। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে পূর্ণাঙ্গ রায়, বিচারপ্রক্রিয়ার বিবরণ, কনস্যুলার যোগাযোগের নথি এবং আইনি সহায়তার তথ্য চাইতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে, বন্দিদের তালিকা পাওয়ার পর মিশন কী পদক্ষেপ নিয়েছিল। দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া গেলে তারও প্রতিকার করতে হবে।
মানবজমিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের দণ্ডিত বন্দি হস্তান্তর চুক্তি নেই। দুই দেশের মধ্যে বিচারিক সহযোগিতা ও বন্দি হস্তান্তরের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ জরুরি। তবে এমন চুক্তি থাকলেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ফেরত আনা সম্ভব হতো, তা নিশ্চিত নয়। বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের মামলা অনুসরণের জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, জরুরি আইনি সহায়তা এবং পরিবারকে অবহিত করার নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি থাকতে হবে। নারী গৃহকর্মীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, দ্রুত উদ্ধার এবং অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা মক্কা ও মদিনাকে শ্রদ্ধা করি। সেই শ্রদ্ধা আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ। কিন্তু সৌদি রাষ্ট্রের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা পবিত্র ভূমির প্রতি অসম্মান নয়। বরং অন্যায়, অবিচার ও মানুষের মর্যাদাহানির বিরুদ্ধে কথা বলার মধ্যেই ধর্মীয় ন্যায়বোধের প্রকাশ ঘটে।
বাংলাদেশের নাগরিকের জীবন কোনো রাষ্ট্রের কাছে তুচ্ছ হতে পারে না। আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, নাগরিকের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে নীরবতা গ্রহণযোগ্য নয়।
পবিত্র ভূমির মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে। কিন্তু সেই পবিত্রতার নামে কোনো রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা চাইতে হবে। আর সৌদি আরবে জীবিকার সন্ধানে যাওয়া প্রতিটি বাংলাদেশির জন্য চাই নিরাপত্তা, অধিকার ও মানুষের মর্যাদা।
লেখক: প্রধান সম্পাদক
তথ্যসূত্র: মানবজমিন, ২১ অক্টোবর ২০২৬; দ্য গার্ডিয়ান, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, মে ২০২৫, নভেম্বর ২০২৫ ও জুলাই ২০২৬; হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, জুন ২০২৫।





