টাকা দিলেই কারখানা চলে না, চাই জ্বালানি নিরাপত্তা

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

দেশের বন্ধ ও স্থবির শিল্পকারখানায় উৎপাদন ফেরাতে ১৭টি ব্যাংকের মাধ্যমে ৪১ হাজার কোটি টাকা অর্থায়নের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৃহত্তর ৬০ হাজার কোটি টাকার কর্মসূচির উদ্দেশ্য উৎপাদন বাড়ানো, বন্ধ কারখানা সচল করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। দীর্ঘদিন ধরে কার্যকরী মূলধনের সংকটে থাকা উদ্যোক্তাদের জন্য এটি স্বস্তির খবর। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। ব্যাংক টাকা দিল, উদ্যোক্তা ঋণ নিলেন, তারপর কারখানায় গ্যাস না থাকলে কী হবে? বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন না হলে সেই টাকা দিয়ে উৎপাদনের চাকা ঘুরবে কীভাবে?

বাংলাদেশের শিল্প খাতের বর্তমান সংকটকে শুধু অর্থের অভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বড় একটি বাস্তবতা আড়ালে থেকে যাবে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান মূলধনের অভাবে ভুগছে, এটি সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে গ্যাসের স্বল্প চাপ, অনিয়মিত সরবরাহ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয় উৎপাদনের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারখানার যন্ত্রপাতি আছে, শ্রমিক আছে, ক্রয়াদেশও হয়তো আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই। এই অবস্থায় নতুন ঋণ উৎপাদনের শক্তি হওয়ার বদলে উদ্যোক্তার ঘাড়ে নতুন দায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যাংকের টাকা বিনামূল্যের অর্থ নয়। এর সঙ্গে সুদ আছে, কিস্তি আছে, নির্দিষ্ট সময়ে ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। একজন উদ্যোক্তা ঋণ নিয়ে কাঁচামাল কিনলেন, শ্রমিক রাখলেন, উৎপাদনের প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু দিনের বড় অংশ গ্যাসের চাপ না থাকায় মেশিন চালাতে পারলেন না। তখন উৎপাদন কমবে, খরচ বাড়বে, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাবে না। আয় না এলেও ব্যাংকের কিস্তি থেমে থাকবে না। শিল্প বাঁচানোর জন্য দেওয়া ঋণ তখন উল্টো খেলাপি ঋণের নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এই কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়ন কর্মসূচিকে শুধু ব্যাংকিং কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে জ্বালানি বিভাগের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। কোন শিল্পাঞ্চলে কত গ্যাস প্রয়োজন, বর্তমানে কতটা সরবরাহ হচ্ছে, নতুন করে সচল হতে যাওয়া কারখানাগুলোর জন্য বাড়তি চাহিদা কত হবে, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর অর্থ ছাড়ের আগেই থাকা উচিত।

বিশেষ করে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কারখানা পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে ঋণ অনুমোদনের পাশাপাশি তার জ্বালানি সক্ষমতাও যাচাই করা প্রয়োজন। যে এলাকায় পর্যাপ্ত গ্যাসই নেই, সেখানে গ্যাসনির্ভর কারখানাকে কোটি কোটি টাকা ঋণ দিয়ে চালু করার চেষ্টা অর্থনৈতিকভাবে কতটা যুক্তিসংগত, সেটিও ভাবতে হবে। প্রয়োজনে শিল্পাঞ্চলভিত্তিক জ্বালানি মানচিত্র তৈরি করে অর্থায়নের সঙ্গে সরবরাহ পরিকল্পনার সমন্বয় করা যেতে পারে।

আরেকটি বিষয় উপেক্ষা করা যাবে না। জ্বালানি নিরাপত্তা মানে শুধু আজকের গ্যাসের চাপ বাড়ানো নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন, পুরোনো ক্ষেত্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি মিশ্রণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, সবকিছুকে একই পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে। আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ বিঘ্নিত হলেই দেশের শিল্প আবার একই সংকটে পড়বে।

আমরা মনে করি, ৪১ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক অর্থায়নকে সফল করতে সরকারকে তিনটি নিশ্চয়তা দিতে হবে। প্রকৃত ও সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ পৌঁছাতে হবে, অর্থের ব্যবহার কঠোরভাবে তদারক করতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে উৎপাদনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে। একটি বাদ দিয়ে অন্য দুটি সফল হওয়ার সুযোগ কম।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এখন সবচেয়ে প্রয়োজন উৎপাদন। উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে, রপ্তানি বাড়বে, ব্যাংকের ঋণ ফেরত আসবে এবং সরকারের রাজস্বও বাড়বে। আর উৎপাদন থেমে থাকলে হাজার কোটি টাকার ঋণও অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি আনতে পারবে না।

অতএব শিল্প পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনায় অর্থায়ন ও জ্বালানিকে আলাদা করে দেখার সময় শেষ। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি অর্থের দুয়ার খুলে দেয়, জ্বালানি বিভাগকেও উৎপাদনের দুয়ার খোলা রাখতে হবে। কারণ কারখানার চাকা ব্যাংকের টাকায় কেনা যায়, কিন্তু সেই চাকা ঘোরাতে জ্বালানি লাগে।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...

বরিশালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইউরো স্টার বাস খাদে, শিশুসহ আহত ৫

গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি বরিশালের গৌরনদীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে...

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হলেন চুয়াডাঙ্গার কৃতি সন্তান ডা.মেহেবুব

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত...