নানাভাইয়ের চোখে নাতির নরওয়ে ডায়েরি, হৃদয়ে বাংলাদেশ

Date:

spot_img

ভূমিকা

একটি শিশু যখন দেশ বদলায়, তখন শুধু তার ঠিকানাই বদলায় না। বদলে যায় তার সকাল, স্কুলে যাওয়ার পথ, জানালার বাইরের দৃশ্য, বন্ধুদের ভাষা, খেলাধুলার নিয়ম, এমনকি বড়দের সঙ্গে তার সম্পর্কের ধরনও।

কিন্তু একটি জিনিস খুব সহজে বদলায় না।

তার ভেতরের দেশ।

তুরানের বয়স আট। এই বয়সে একটি শিশুর পৃথিবী খুব বড় নয়, আবার খুব ছোটও নয়। তার পৃথিবীতে থাকে মা-বাবা, স্কুল, বন্ধু, খেলা, প্রিয় খাবার, পরিচিত রাস্তা, আর পরিবারের মানুষদের মুখ। সেই পরিচিত পৃথিবী ছেড়ে ১৩ আগস্ট ২০২৬ সে নরওয়ের পথে রওনা হলো।

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে তার প্রথম ছবিটি যখন দেখি, তখন মনে হয়েছিল, এ শুধু বিদেশযাত্রার ছবি। বিমানের ভেতরে জানালার পাশে বসে যখন সে দুই আঙুল তুলে বিজয়ের চিহ্ন দেখাল, মনে হলো, শিশুর কাছে পৃথিবী এখনো কত সহজ। সামনে যে নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন স্কুল, নতুন নিয়ম, নতুন একাকিত্বও হয়তো আছে, সেসব তখন তার মুখে ধরা পড়েনি।

অসলোয় পৌঁছে আরেকটি ছবিতে দেখি, সে নিজের স্যুটকেস নিজেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে ট্রেন ধরতে।

সেই ছবিটি আমার মনে থেকে গেছে।

একটি ছোট্ট ছেলে। হাতে নিজের লাগেজ। সামনে অচেনা পথ।

দূরে বসে আমি হঠাৎ বুঝলাম, তুরানের নরওয়ে যাত্রা শুধু আমার নাতির বিদেশে যাওয়া নয়। এটি একটি শিশুর নতুন সমাজে ঢুকে পড়ার গল্প। আর আমার জন্য এটি আরেকটি জানালা, যে জানালা দিয়ে আমি নরওয়েকে দেখব, আবার নিজের দেশ বাংলাদেশকেও নতুন করে দেখব।

আমি তার নানাভাই।

এই পরিচয়ের মধ্যে আমার আনন্দ আছে, দুর্বলতা আছে, অকারণ দুশ্চিন্তা আছে, আবার এক ধরনের গর্বও আছে। নাতির ছবি দেখলে প্রথমে আমি নানা। কিন্তু তার পরে জেগে ওঠে সাংবাদিক জীবনের পুরোনো অভ্যাস। যা দেখি, তার পেছনের কারণ জানতে ইচ্ছে করে। একটি স্কুলের নিয়ম দেখলে ভাবি, কেন এমন? একটি শিশুকে একা হাঁটতে দেখলে প্রশ্ন করি, এখানে বড়রা কেন পিছিয়ে থাকে? সাইকেল চালানো কেন স্কুলের পাঠ? সাঁতার শেখানো কেন শিক্ষার অংশ? নিজের ব্যাগ নিজে গুছিয়ে নেওয়া, নিজের কাজ নিজে করা, ট্রাফিকের নিয়ম শেখা, এসবের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক কোথায়?

তুরানের নরওয়ে জীবন শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই এসব প্রশ্ন আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

একদিন খবর পেলাম, সে নিজে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। আরেক দিন জানলাম, স্কুলে সাইকেল চালানো শেখানো হচ্ছে। তারপর ছবি এলো, গলায় মেডেল, হাতে সনদ। সামনে আবার সাঁতার শেখানো হবে। সাপ্তাহিক পাঠসূচিতে দেখি, ভাষা ও গণিতের পাশে সংগীত আছে, শিল্প ও কারুশিল্প আছে, খাদ্য ও স্বাস্থ্য আছে, শরীরচর্চা আছে।

আমি তখন ভাবি, শিক্ষা আসলে কোথা থেকে শুরু হয় আর কোথায় শেষ হয়?

আমাদের দেশে আমরা শিশুর ফলাফল নিয়ে খুব ভাবি। বাংলা কত পেল, ইংরেজিতে কত, গণিতে কত, পরীক্ষায় প্রথম হলো কি না। এসবের মূল্য আছে। জ্ঞানের মূল্য আছে। বইয়ের মূল্য আছে।

কিন্তু একটি শিশু যদি রাস্তা পার হতে না জানে, পানিতে পড়ে গেলে নিজেকে বাঁচাতে না জানে, আগুন লাগলে কী করতে হয় না জানে, নিজের ছোট কাজ নিজে করতে না শেখে, অন্য মানুষের নিরাপত্তার কথা না ভাবে, তবে তার শিক্ষার কোথাও কি শূন্যতা থেকে যায় না?

তুরানের প্রতিদিনের ছোট ছোট ঘটনা আমাকে সেই প্রশ্নই করছে।

তবে এই লেখার শুরুতেই একটি কথা স্পষ্ট করে রাখতে চাই।

আমি নরওয়েকে দেখব, কিন্তু বাংলাদেশকে ছোট করে নয়।

দূরের দেশ দেখে নিজের দেশকে অবজ্ঞা করা খুব সহজ। কিন্তু সেটি আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার জন্ম বাংলাদেশে। আমার স্মৃতি, ভালোবাসা, ভাষা, পেশা, সংগ্রাম, আত্মীয়তা, শিকড় সবই এই দেশের সঙ্গে জড়িয়ে।

বাংলাদেশের পরিবারে একটি শিশুকে যেভাবে আগলে রাখা হয়, সেই মায়ার গভীরতা অন্য কোথাও হুবহু পাওয়া যাবে না। নানা-নানী, দাদা-দাদি, খালা-মামা, চাচা-ফুফু, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন মিলিয়ে একটি শিশুর চারপাশে যে নিরাপদ আবেগের বৃত্ত তৈরি হয়, তার মূল্য কম নয়।

তুরান বাংলাদেশে থাকলে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া হতো, ফিরিয়ে আনা হতো, কেউ না কেউ খেয়াল রাখত সে খেয়েছে কি না, ব্যাগ গুছিয়েছে কি না, জামা পরেছে কি না।

এতে ভালোবাসা আছে।

নরওয়েতে এসে দেখছি, ভালোবাসার আরেকটি ভাষাও আছে।

সেখানে শিশুকে বলা হচ্ছে, নিজের ব্যাগ তুমি বহন করো। নিজের পথ তুমি চিনতে শেখো। নিজের সাইকেলের নিরাপত্তা তুমি বোঝো। নিজের শরীর, নিজের জীবন, নিজের দায়িত্ব ধীরে ধীরে নিজে নিতে শেখো।

দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য আছে। কিন্তু তার মানে এই নয়, একটি ভালো আর অন্যটি খারাপ।

বরং আমার আগ্রহ এখানেই।

আমাদের মায়ার সঙ্গে যদি তাদের আত্মনির্ভরতার শিক্ষা যোগ করা যায়?

আমাদের পারিবারিক বন্ধনের সঙ্গে যদি জীবনদক্ষতার চর্চা আরও গভীর করা যায়?

আমাদের শিশুরা যদি বইয়ের পাশাপাশি সাঁতার শেখে, ট্রাফিক শেখে, বিপদে কী করতে হয় শেখে, নিজের কাজ নিজে করতে শেখে, তাতে কি তারা কম বাংলাদেশি হয়ে যাবে?

বরং আরও সক্ষম মানুষ হবে।

এই বই তাই শুধু তুরানের দৈনন্দিন জীবনের গল্প নয়।

এটি একটি শিশুকে কেন্দ্র করে দুটি সমাজকে বোঝার চেষ্টা।

কখনো তার স্কুলের কথা আসবে। কখনো ভাষা শেখার গল্প। কখনো বন্ধু। কখনো মাঠ। কখনো শীত। কখনো তুষার। কখনো তার মন খারাপ হবে। কখনো সে নতুন কিছু শিখে আনন্দে ফিরবে।

আর দূরে বাংলাদেশে বসে আমি সেই দিনগুলোর কথা লিখে রাখব।

কারণ শিশুর জীবন খুব দ্রুত বদলে যায়।

আজ যে ছেলে স্যুটকেস টেনে অসলো বিমানবন্দরের রেলস্টেশনের দিকে যাচ্ছে, কয়েক বছর পর সে হয়তো এই ছবির কথাই মনে করতে পারবে না।

আজ যে নরওয়েজীয় শব্দটি তার কাছে কঠিন, একদিন সেটিই তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

আজ যে স্কুলে যেতে তার একটু ভয় লাগে, একদিন হয়তো সেই স্কুলই হবে তার পরিচিত পৃথিবী।

তাই এই সময়টুকু ধরে রাখা দরকার।

শুধু স্মৃতির জন্য নয়।

বোঝার জন্যও।

আমি চাই, এই ডায়েরির পাতায় তুরানের বেড়ে ওঠা থাকবে, কিন্তু তার পাশে বাংলাদেশও থাকবে।

সে নরওয়ের রাস্তা চিনবে, কিন্তু বাংলাদেশের গল্প ভুলবে না।

সে নতুন ভাষা শিখবে, কিন্তু বাংলার শব্দ তার ভেতরে থাকবে।

সে অন্য দেশের সমাজে বড় হবে, কিন্তু তার পরিচয়ের একটি অংশে যেন সবসময় লেখা থাকে, বাংলাদেশ।

এই কারণেই এই বইয়ের নামের শেষ কথাটি আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—

হৃদয়ে বাংলাদেশ।

তুরান নরওয়েতে বড় হোক।

পৃথিবী দেখুক।

ভালো শিক্ষা পাক।

নিজের পায়ে দাঁড়াক।

স্বাধীন মানুষ হোক।

কিন্তু কোনো এক শীতের রাতে, জানালার বাইরে তুষার পড়ার সময়, যদি তার মনে হঠাৎ বাংলাদেশের বর্ষার গন্ধ ভেসে আসে, যদি কোনো খাবারে নানীর রান্নার স্বাদ খুঁজে পায়, যদি বাংলায় কারও ডাক শুনে বুকের ভেতর একটু আলাদা অনুভূতি হয়, তাহলে বুঝব শিকড় এখনো বেঁচে আছে।

আর আমার এই ডায়েরির কাজও হয়তো তখনই সার্থক হবে।

একজন নানাভাই দূরে বসে নাতির নতুন পৃথিবী দেখে লিখছে।

চোখ নরওয়ের দিকে।

কিন্তু মন?

মন পড়ে আছে বাংলাদেশে।

ইতি-
নানা ভাই
আলী কদর পলাশ

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...

বরিশালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইউরো স্টার বাস খাদে, শিশুসহ আহত ৫

গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি বরিশালের গৌরনদীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে...

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হলেন চুয়াডাঙ্গার কৃতি সন্তান ডা.মেহেবুব

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত...