হামজার পাঁচ বছরের প্রধানমন্ত্রিত্ব

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

কুষ্টিয়ার বাতাসে আজকাল গড়াই নদীর সোঁদা গন্ধের সহিত আর একটি নতুন সুবাস মিশিয়াছে। তাহা ক্ষমতার সুবাস। একদা যেই কুষ্টিয়ায় মাহবুব উল আলম হানিফের নাম উচ্চারিত হইলেই প্রশাসনের কলম নড়িত, নেতাদের টেলিফোন বাজিত এবং অনেকের কপালে ঘাম জমিত। সেই কুষ্টিয়ার আকাশে এখন নতুন নক্ষত্রের উদয় ঘটিয়াছে। তাঁহার নাম মাওলানা আমির হামজা।

তিনি ওয়াজ করেন, রাজনীতি করেন, সংসদ করেন, আবার প্রয়োজনবোধে নিজের নির্বাচনী এলাকায় নিজেকেই প্রধানমন্ত্রী বলিয়া ঘোষণা করেন। গণতন্ত্রে একজন মানুষ একসঙ্গে কতগুলি দায়িত্ব পালন করিতে পারেন, কুষ্টিয়া সম্ভবত তাহার একটি জীবন্ত গবেষণাগার।

সম্প্রতি তিনি ঘোষণা করিয়াছেন, কুষ্টিয়া সদর আসনে আগামী পাঁচ বছর তিনিই প্রধানমন্ত্রী। সংবিধানবিদগণ হয়তো ইহার ব্যাখ্যা খুঁজিতেছেন। কিন্তু কুষ্টিয়ার সাধারণ মানুষ এত জটিলতায় যাইতেছেন না। তাঁহারা বুঝিয়াছেন, ঢাকায় একজন প্রধানমন্ত্রী থাকিবেন, আর কুষ্টিয়ায় থাকিবেন স্থানীয় সংস্করণ।

ইহা অনেকটা ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থার ন্যায়। কেন্দ্রীয় সরকার ঢাকায়, শাখা সরকার কুষ্টিয়ায়।

আমির হামজা অবশ্য পরে বলিয়াছেন, কথাটি তিনি রূপক অর্থে বলিয়াছেন। বাংলা সাহিত্যে রূপকের ব্যবহার বহু পুরাতন। কবিগণ চাঁদকে মুখ বলেন, চোখকে পদ্ম বলেন। কিন্তু নির্বাচনী এলাকাকে রাষ্ট্র এবং নিজেকে প্রধানমন্ত্রী বলিবার রূপকটি সম্ভবত বাংলা অলংকারশাস্ত্রে নতুন সংযোজন।

তাঁহার বক্তব্য অনুসারে, ডিসি, এসপি, ইউএনও নিরপেক্ষ না থাকিলে কুষ্টিয়া হইতে বিদায় করিয়া দেওয়া হইবে। সরকারি কর্মকর্তাগণ অতএব এখন চাকরির বিধিমালার পাশাপাশি স্থানীয় রূপকশাস্ত্রও পাঠ করিতে পারেন। কারণ কোন বাক্য নির্দেশ, কোনটি উপমা এবং কোনটি রাজনৈতিক কবিতা, তাহা বুঝিতে ভুল হইলে বিপদ ঘটিতে পারে।

কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে অবশ্য কেবল ভাষার অলংকারই নাই। রহিয়াছে বেসবল ব্যাটও।

নিজের গাড়িতে দেশীয় অস্ত্র রাখিবার অভিযোগ উঠিলে সংসদ সদস্য মহোদয় সাংবাদিকের সম্মুখে একটি বেসবল ব্যাট প্রদর্শন করিয়াছেন। সরকারের পক্ষ হইতে তাঁহাকে আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়া হয় নাই বলিয়াই নাকি নিরাপত্তার জন্য এই ব্যাট সঙ্গে রাখেন।

বাংলাদেশে বেসবল খুব জনপ্রিয় খেলা নহে। তথাপি কুষ্টিয়ায় খেলাটির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলিয়া মনে হইতেছে। অন্তত একজন সংসদ সদস্য খেলাটির অন্যতম প্রধান সরঞ্জাম সর্বক্ষণ সঙ্গে রাখেন। ভবিষ্যতে সংসদীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় কুষ্টিয়া সদর আসন বেসবলে স্বর্ণপদক পাইলে বিস্মিত হইবার কারণ থাকিবে না।

তবে কুষ্টিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাবলি কেবল হাস্যরসের নহে। গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের সহিত জামায়াত শিবিরের সংঘর্ষ, কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং আহত হওয়ার অভিযোগ গুরুতর। গণঅধিকার নেতাকর্মীরা দাবি করিয়াছেন, হামলার পর তাঁহারা হুমকির কারণে পালাইয়া বেড়াইতেছেন। আমির হামজা হামলা ও ভাঙচুরকে সমর্থন করেন নাই বলিয়া জানিয়েছেন। তাঁহার ভাষ্য, সংঘর্ষের পর তিনি বাসায় ফিরিয়া গিয়াছিলেন, পরে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা তাঁহার অজান্তে কার্যালয়ে হামলা চালায়।

অর্থাৎ নেতা বাসায়, অনুসারীরা পথে। নেতা জানেন না, অনুসারীরা জানেন কী করিতে হইবে। রাজনীতিতে ইহাকেই সম্ভবত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা বলা যায়।

আমির হামজার রাজনৈতিক জীবনের আর একটি বৈশিষ্ট্য তাঁহার বক্তব্য। বক্তৃতার মঞ্চে তাঁহার চিন্তা এত দ্রুত অগ্রসর হয় যে, তথ্য কখনো কখনো পিছনে পড়িয়া যায়।

কখনো তিনি বলিয়াছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে বহু বছর আজান দেওয়া হইত না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলিয়াছে, কথাটি সঠিক নহে। কখনো বলিয়াছেন, তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হইয়াছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সময়ের হিসাব মিলাইয়া তাহার সত্যতা পায় নাই। পরে তিনি বলিয়াছেন, মুখ ফসকাইয়া কথা বাহির হইয়াছে।

মুখ বড় রহস্যময় বস্তু। সাধারণ মানুষের মুখ ফসকাইলে একটি দুইটি শব্দ বাহির হয়। রাজনীতিবিদের মুখ ফসকাইলে কখনো সম্পূর্ণ ইতিহাসই বাহির হইয়া আসে।

করোনার সময়ও তিনি নানা বক্তব্য দিয়া আলোচিত হইয়াছিলেন। কখনো ধর্মীয় ব্যাখ্যা, কখনো রাজনৈতিক প্রশংসা, কখনো চলচ্চিত্র অভিনেত্রীর সৌন্দর্য বিষয়ে পর্যবেক্ষণ। রাশ্মিকা মান্দানার সৌন্দর্য বিষয়ে তাঁহার বক্তব্যও এক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবল আলোড়ন তুলিয়াছিল।

একজন ওয়ায়েজ যদি একই বক্তৃতাজীবনে করোনা, রাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয়, নির্বাচন এবং দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের নায়িকার সৌন্দর্য সমান দক্ষতায় আলোচনা করিতে পারেন, তবে তাঁহাকে কেবল ইসলামী বক্তা বলিলে তাঁহার জ্ঞানের পরিধিকে ছোট করা হয়।

রাজনীতিতেও তাঁহার অভিযাত্রা নাটকীয়। ওয়াজের মঞ্চ হইতে তিনি জামায়াতের প্রার্থী হইলেন, বিএনপির প্রার্থীকে পরাজিত করিয়া সংসদে গেলেন। যে আসন একসময় আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি বলিয়া পরিচিত ছিল, সেখানে এখন নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র সৃষ্টি হইয়াছে।

বিএনপির স্থানীয় নেতারা অবশ্য বলিতেছেন, তাঁহাদের নিজেদের বিভক্তিই পরাজয়ের বড় কারণ। চারটি গ্রুপের কথা শোনা যায়। অর্থাৎ আমির হামজার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ছিলেন, কিন্তু তাঁহার বিপক্ষে মাঠে হয়তো বিএনপিই চার ভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিয়াছে।

রাজনীতির অঙ্ক বড় বিচিত্র। চারটি গ্রুপ যোগ করিলে শক্তি বাড়িবার কথা, কিন্তু বাংলাদেশে প্রায়ই ফল হয় বিয়োগ।

কুষ্টিয়ার আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীও নাকি এখনো এলাকায় রহিয়াছেন। ক্ষমতার পালাবদল হইয়াছে, কিন্তু শহর ফাঁকা হয় নাই। পুরাতন রাজা গিয়াছেন, নতুন প্রভাবশালী আসিয়াছেন। শুধু মার্কার রং বদলাইয়াছে, ক্ষমতার স্বভাব কতখানি বদলাইয়াছে, সেই পরীক্ষাই এখন চলিতেছে।

আমির হামজা বলিয়াছেন, তিনি দখল, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হইতে কুষ্টিয়াকে মুক্ত রাখিতে চান। কথাটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এখন কেবল একটি ক্ষুদ্র সমস্যা রহিয়াছে। তাঁহার অনুসারীদেরও একই বক্তৃতা মনোযোগ দিয়া শুনাইতে হইবে।

কারণ গণতন্ত্রে সংসদ সদস্যের কাজ নিজের নির্বাচনী এলাকাকে ব্যক্তিগত রাজ্য ভাবা নহে। প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি দেওয়া নহে। বিরোধীদের ভয় পাইয়ে দেওয়া তো নহেই।

তিনি যদি সত্যই কুষ্টিয়ার মানুষের প্রতিনিধি হন, তবে তাঁহার সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘প্রধানমন্ত্রী’ নহে, ‘প্রতিনিধি’।

আর যদি পাঁচ বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হইতেই হয়, তবে কুষ্টিয়ার নাগরিকেরা অন্তত একটি মন্ত্রিসভার তালিকা দাবি করিতে পারেন।

গড়াই নদীকে জলসম্পদমন্ত্রী করা যাইতে পারে, বেসবল ব্যাটকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বক্তৃতাকে তথ্যমন্ত্রী।

আর ‘মুখ ফসকানো’ বিভাগটির দায়িত্ব?

সেটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজের কাছেই রাখিতে পারেন।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...

বরিশালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইউরো স্টার বাস খাদে, শিশুসহ আহত ৫

গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি বরিশালের গৌরনদীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে...

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হলেন চুয়াডাঙ্গার কৃতি সন্তান ডা.মেহেবুব

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত...