শেষ প্রহরের বিদূষক-২

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

রাত প্রায় শেষ। বৃষ্টির পর জানালার নিচে জমে থাকা পানিতে শহরের বাতিগুলো কাঁপছিল। আমি গত সপ্তাহের খবর নিয়ে বসেছি। এমন সময় পুরোনো প্রেমিকার ফোন।

ফোন ধরতেই বলল,
কী করছ?

বললাম,
দেশের খবর পড়ছি।

সে বলল,
দেশের খবর পড়তে এখন কত সময় লাগে?

বললাম,
অনেক।

প্রেমিকা বলল,
আশ্বাসগুলো বাদ দিয়ে পড়লে?

আমি চুপ করে গেলাম।

সে বলল,
বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত। এদিকে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছেন, চিঠিও পাঠিয়েছেন।

বললাম,
জ্বালানি সহযোগিতা চেয়েছেন। সরকার বলেছে, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে সংকট বেড়েছে। মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আনা, কারিগরি পরামর্শ নেওয়া এবং বিকল্প উৎস তৈরির চেষ্টা চলছে।

প্রেমিকা বলল,
আমাদের প্রেমের সময় তুমিও আমাকে অনেক চিঠি লিখেছিলে।

বললাম,
তার সঙ্গে গ্যাসের কী সম্পর্ক?

সে বলল,
কোনো সম্পর্ক নেই। তোমার চিঠিতেও আগুন ছিল, কিন্তু রান্না করা যেত না।

আমি বললাম,
সরকার তো সংকট সমাধানে দিনরাত কাজ করছে।

প্রেমিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

বলল,
দিনরাত কাজ করলে ভালো। শুধু রাতের অন্ধকারটা যেন মানুষের ঘরে না থাকে আর দিনের আলোটা যেন সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মধ্যে আটকে না যায়।

আমি বললাম,
বন্ধ সরকারি শিল্পকারখানাগুলো চালুর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যেই প্রক্রিয়া শেষ করতে বলা হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আনার কথাও বলা হয়েছে।

প্রেমিকা বলল,
বন্ধ কারখানা চালু হবে শুনে ভালো লাগছে।

বললাম,
তাহলে খুশি হও।

সে বলল,
হচ্ছি। তবে একটা ভয় আছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,
কী ভয়?

সে বলল,
কারখানা চালু করার দায়িত্ব যাদের, কারখানা বন্ধ হওয়ার সময়ও তো তারাই দায়িত্বে ছিল।

বললাম,
এবার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা হবে।

সে হেসে বলল,
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করবে আমলারা। অর্থাৎ গিঁট খুলবে সেই হাত, যে হাত গিঁটটি এত যত্ন করে বেঁধেছিল।

আমি বললাম,
সবকিছু নিয়ে ব্যঙ্গ করো কেন?

প্রেমিকা বলল,
দেশে যখন বাস্তবতাই ব্যঙ্গ হয়ে যায়, তখন মানুষ আলাদা করে ব্যঙ্গ লিখবে কীভাবে?

খবরের আরেকটি পাতা খুললাম।

বললাম,
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গর এসেছিলেন। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, কৃষি ও প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বানও জানানো হয়েছে।

প্রেমিকা বলল,
বিদেশি অতিথি এলেই আমাদের চোখ এত উজ্জ্বল হয়ে ওঠে কেন?

বললাম,
বিনিয়োগ আসবে।

সে বলল,
প্রতিটি বিদেশি অতিথিকে আমরা এমনভাবে দেখি, যেন তিনি বিমানবন্দর থেকে নামার সময় এক হাতে বিনিয়োগ আর অন্য হাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেমেছেন।

বললাম,
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দরকার।

সে বলল,
অবশ্যই দরকার। কিন্তু নিজের ঘর অগোছালো রেখে অতিথিকে বারবার বললে, ‘আমাদের ঘরে টাকা রাখুন’, অতিথি প্রথমে তালা, জানালা আর বাড়ির কাগজ দেখতে চাইবে।

আমি বললাম,
তুমি এখন অর্থনীতিবিদ?

সে বলল,
না। তোমার সঙ্গে প্রেম করে শিখেছি, শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিনিয়োগ টেকে না।

আমি বিষয় পাল্টে বললাম,
সার্জিও গর রোহিঙ্গা শিবিরও পরিদর্শন করেছেন।

প্রেমিকা একটু থামল।

তারপর বলল,
রোহিঙ্গাদের দেখতে পৃথিবীর অনেক মানুষ আসে। ছবি তোলে, কথা বলে, ফিরে যায়। রোহিঙ্গারা শুধু যেতে পারে না।

আমি কোনো উত্তর দিলাম না।

সে আবার বলল,
শরণার্থীর জীবনে সবচেয়ে দীর্ঘ জিনিস কী জানো?

বললাম,
অপেক্ষা?

সে বলল,
না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতির বাক্য।

বাইরে আবার বৃষ্টি নামল।

প্রেমিকা বলল,
ঢাকার রাস্তায় পানি উঠেছে?

বললাম,
একটু বৃষ্টি হলেই ওঠে।

সে বলল,
বৃষ্টি কি এখন বিরোধী দলে যোগ দিয়েছে?

বললাম,
কেন?

সে বলল,
সব ব্যর্থতার দায় তার ওপর চাপানো হয়।

চট্টগ্রামে জুলাইয়ের শুরুতে ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টির কথা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসেছে। ঘরবাড়ি, ফসল, হাঁস মুরগি, শিশুদের বইখাতা সব ভেসে যাওয়ার করুণ চিত্রও উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনে চরম বৃষ্টিপাত আরও তীব্র হচ্ছে।

আমি বললাম,
এত বৃষ্টি হলে পানি তো জমবেই।

প্রেমিকা বলল,
আকাশ পানি দেবে। পানি বের হওয়ার পথ তৈরি করবে কে?

বললাম,
কর্তৃপক্ষ।

সে বলল,
কর্তৃপক্ষ এখন একটি রহস্যময় প্রাণী। সংবাদ সম্মেলনে তাকে দেখা যায়, জলাবদ্ধতার সময় পাওয়া যায় না।

আমি বললাম,
খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নালা পরিষ্কার না করা, অনেক কারণ আছে।

প্রেমিকা বলল,
কারণ এত বেশি যে, দায়ী কাউকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সবাই দায়ী হলে শেষ পর্যন্ত কেউই দায়ী থাকে না।

বললাম,
তুমি খুব কঠিন কথা বলছ।

সে বলল,
হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে নরম কথা বলা কঠিন।

আমি আবার খবর দেখতে লাগলাম।

বললাম,
প্রকল্পে অনিয়ম দেখা গেলে টেন্ডার বাতিল করার ঘোষণা এসেছে।

প্রেমিকা বলল,
অনিয়ম দেখা গেলে?

বললাম,
হ্যাঁ।

সে বলল,
যে অনিয়ম দেখা যায় না, তার কী হবে?

আমি বললাম,
তদন্ত হবে।

সে বলল,
তারপর কমিটি হবে?

বললাম,
হতে পারে।

সে বলল,
তারপর প্রতিবেদন হবে?

বললাম,
হ্যাঁ।

সে বলল,
তারপর প্রতিবেদন রাখার জন্য নতুন আলমারি কেনার টেন্ডার হবে?

আমি হাসলাম।

সে বলল,
হাসছ কেন?

বললাম,
তোমার কথায়।

প্রেমিকা বলল,
আমি হাসানোর জন্য বলিনি। এই দেশে অনেক সময় অনিয়মের তদন্তও আরেকটি প্রকল্প হয়ে যায়।

সে জানতে চাইল,
বাজারের খবর কী?

বললাম,
কাঁচা মরিচের দাম কোথাও দুই সপ্তাহে প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে।

প্রেমিকা বলল,
ভালোই তো।

আমি অবাক হয়ে বললাম,
ভালো কেন?

সে বলল,
দেশে অন্তত একটি জিনিস বিনা বিদেশি বিনিয়োগে ছয় গুণ হয়েছে।

আমি বললাম,
মানুষের কষ্ট হচ্ছে।

সে বলল,
কষ্টের খবর পুরোনো। এখন দাম বাড়ার খবরের সঙ্গে মানুষ শুধু হিসাব করে, কোন তরকারি থেকে কোন উপকরণ বাদ দেওয়া যায়।

আমি বললাম,
কাঁচা মরিচ বাদ দিলে স্বাদ থাকবে?

সে বলল,
স্বাদ নিয়ে এত ভাবছ কেন? সাধারণ মানুষ এখন বাজার থেকে স্বাদ নয়, বেঁচে ফেরার চেষ্টা করে।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর প্রেমিকা বলল,
গত সপ্তাহের সবচেয়ে ভালো খবর কী?

আমি বললাম,
বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগ ভালো। জ্বালানির বিকল্প উৎস খোঁজা ভালো। বিদেশি বিনিয়োগ আনার চেষ্টা ভালো। রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা দেখতে প্রধানমন্ত্রী নিজে সড়কে বেরিয়েছেন, এটাও ইতিবাচক।

সে বলল,
সবই ভালো।

বললাম,
তাহলে সমস্যা কোথায়?

প্রেমিকা বলল,
সমস্যা হলো, এই দেশে ভালো খবর শুনেও মানুষ সঙ্গে সঙ্গে খুশি হয় না। আগে দেখে, কথাটা বাস্তব হয় কি না।

বললাম,
মানুষের বিশ্বাস কমে গেছে?

সে বলল,
বিশ্বাস একদিনে কমে না। প্রতিটি অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি তার শরীর থেকে একটু একটু করে মাংস তুলে নেয়।

আমি বললাম,
এবার হয়তো কাজ হবে।

সে হাসল।

বলল,
আমাদের প্রেমের সময় তুমিও এই বাক্যটি খুব বলতে।

আমি বললাম,
তারপরও তো আমাদের অনেক সুন্দর স্মৃতি আছে।

সে বলল,
দেশেরও অনেক সুন্দর স্মৃতি আছে। কিন্তু মানুষ স্মৃতি খেয়ে বাঁচতে পারে না।

আমি চুপ করলাম।

ফোন কাটার আগে সে বলল,
শোনো, বন্ধ কারখানা খোলো। বন্ধ খাল খোলো। বিনিয়োগের দরজা খোলো। টেন্ডারের ফাইল খোলো। কিন্তু সবার আগে মানুষের বিশ্বাসের দরজাটা খোলো।

বললাম,
ওটা কীভাবে খুলবে?

সে বলল,
চাবিটা খুব সাধারণ।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,
কী?

সে বলল,
যা বলবে, তা করবে। আর যা করতে পারবে না, তা বলবে না।

ফোন কেটে গেল।

জানালার বাইরে বৃষ্টি থেমেছে। রাস্তায় পানি তখনো জমে আছে। সেই পানির ওপর একটি লাল সবুজ পতাকার ছায়া কাঁপছিল।

হঠাৎ মনে হলো, দেশটা আশ্বাসে চলে না। দেশ চলে বিশ্বাসে।

আর বিশ্বাসের দুর্ভাগ্য হলো, তাকে আমদানি করা যায় না।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...

বরিশালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইউরো স্টার বাস খাদে, শিশুসহ আহত ৫

গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি বরিশালের গৌরনদীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে...

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হলেন চুয়াডাঙ্গার কৃতি সন্তান ডা.মেহেবুব

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত...