
আলী কদর পলাশ
প্রিয় পাঠক,
২০১৭ সাল।
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের কাছাকাছি লাস রোজাস। সেখানেই স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রশিক্ষণকেন্দ্র। একটি শ্রেণিকক্ষের সামনের সারিতে বসে আছেন সদ্য অবসর নেওয়া এক ফুটবলার।
মাঠে কীভাবে খেলতে হয়, তা তাঁর জানা। কিন্তু মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে একটি দলকে কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, সেটি শিখতেই তিনি এসেছেন। এখন আর পায়ে বুট নেই। সামনে খাতা। নতুন পরিচয় গড়ার প্রস্তুতি।
শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে যিনি পাঠ দিচ্ছেন, তিনি তখন স্পেনের বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের প্রশিক্ষক। বিষয় দুটি ছিল ফুটবলের বিবর্তন এবং দল গঠন।
সেদিন শিক্ষক জানতেন না, সামনের সারিতে বসে থাকা ছাত্রটি একদিন বিশ্বকাপ জিতবে। ছাত্রও জানতেন না, নয় বছর পর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল ম্যাচে তাঁকে দাঁড়াতে হবে সেই শিক্ষকের বিপরীতে।
বিশ্বকাপ জিততে হলে ছাত্রকে হারাতে হবে তাঁর শিক্ষককেই।
শিক্ষক লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ছাত্র লিওনেল স্কালোনি।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করার দুই বছর পর উয়েফা প্র লাইসেন্স নিতে লাস রোজাসের সেই কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন স্কালোনি। দে লা ফুয়েন্তে ছিলেন তাঁর শিক্ষকদের একজন। কোনো ক্লাবের কৌশল শেখানোর জন্য নয়, ভবিষ্যতের একজন প্রশিক্ষককে তৈরি করার জন্য তাঁদের দেখা হয়েছিল।
শ্রেণিকক্ষে স্কালোনি নীরব ছাত্র ছিলেন না। তিনি প্রশ্ন করতেন। তর্ক করতেন। কোনো বক্তব্য পছন্দ না হলে সরাসরি বলতেন, তিনি বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখছেন।
বহু বছর পর দে লা ফুয়েন্তে সেই ছাত্রের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, স্কালোনির মধ্যে একধরনের অস্থির কৌতূহল ছিল। তিনি সবকিছু নিয়ে আলোচনা করতেন। শিক্ষকের বক্তব্যও বিনা প্রশ্নে মেনে নিতেন না।
হয়তো সেখানেই একজন প্রশিক্ষকের জন্ম হচ্ছিল।
কোর্সটি শেষ হওয়ার পর স্কালোনিকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়নি। ২০১৮ সালে আর্জেন্টিনার বয়সভিত্তিক দলের দায়িত্ব পান। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে জাতীয় দলের অন্তর্বর্তী প্রশিক্ষক করা হয়।
তখন তাঁকে নিয়ে প্রশ্নের শেষ ছিল না।
বড় কোনো ক্লাব পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই। জাতীয় দলের দায়িত্ব সামলানোর মতো দীর্ঘ প্রশিক্ষক জীবনও নেই। আর্জেন্টিনার মতো দলের ভার তাঁর হাতে তুলে দেওয়া ঠিক হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ ছিল নিজের দেশেই।
স্কালোনি কোনো উত্তর দেননি। তিনি একটি দল গড়তে শুরু করেছিলেন।
দলটি শুধু মেসিকে ঘিরে তৈরি হয়নি। সেখানে জায়গা পেয়েছিল বন্ধুত্ব, বিশ্বাস এবং একে অন্যের জন্য লড়াই করার শক্তি। স্কালোনি খেলোয়াড়দের বোঝাতে পেরেছিলেন, জাতীয় দলের জার্সিতে কেউ একা নয়।
২০২১ সালে আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের শিরোপা খরা শেষ হলো। এলো কোপা আমেরিকা। পরের বছর ফিনালিসিমা। তারপর কাতার বিশ্বকাপ। ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা।
যাঁকে একসময় সাময়িক সমাধান মনে করা হয়েছিল, তিনিই হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম সফল প্রশিক্ষক।
অন্যদিকে শিক্ষকও নিজের পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
দে লা ফুয়েন্তে বহু বছর স্পেনের বয়সভিত্তিক দল নিয়ে কাজ করেছেন। জাতীয় দলের বড় চাকরিটি তাঁর কাছে এসেছিল অনেক দেরিতে। তত দিনে তাঁর বয়স ষাট পেরিয়েছে।
কিন্তু অপেক্ষার সেই বছরগুলো নষ্ট হয়নি।
স্পেনের তরুণ ফুটবলারদের তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁদের অনেককে কিশোর বয়স থেকে গড়ে তুলেছেন। দল পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর কাছে কৌশলের পাশাপাশি মানুষের চরিত্রও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের চেয়ে ভালো মানুষকে নিয়ে শক্তিশালী দল গড়া সহজ।
২০২৩ সালে তাঁর স্পেন উয়েফা নেশনস লিগ জিতল। ২০২৪ সালে জিতল ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ।
একই বছরে শিক্ষক ইউরোপের সেরা হলেন। ছাত্র হলেন দক্ষিণ আমেরিকার সেরা।
তবু তাঁদের সম্পর্ক বদলায়নি।
স্কালোনি প্রকাশ্যে বলেছেন, লাস রোজাসের কোর্সে অংশ নেওয়া নতুন প্রশিক্ষকদের দে লা ফুয়েন্তে অনেক সাহায্য করেছিলেন। তাঁর দল পরিচালনার ধরন স্কালোনির ভালো লাগে। বিশেষ করে খেলোয়াড়েরা যেভাবে তাঁর জন্য নিজেদের উজাড় করে দেন।
দে লা ফুয়েন্তেও সাবেক ছাত্রকে শুধু ছাত্র হিসেবে দেখেননি। বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকা জয়ের পর তিনি স্কালোনিকে ‘মাস্টার’ বলে সম্মান জানিয়েছেন।
শিক্ষক যখন ছাত্রকে মাস্টার বলেন, তখন বোঝা যায় শ্রেণিকক্ষের সম্পর্কটি কত দূর এগিয়েছে।
নয় বছর আগে একজন ছিলেন শিক্ষক। অন্যজন ছাত্র। এখন দুজনই বিশ্বজয়ী প্রশিক্ষক।
একজনের হাতে ইউরোপের সেরা দলের দায়িত্ব। অন্যজনের হাতে বিশ্ব ও দক্ষিণ আমেরিকার চ্যাম্পিয়নদের ভার।
স্পেন ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছে। আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ফিরে এসেছে। এখন বিশ্বকাপের শেষ রাতে মুখোমুখি হবে দুই দল।
এক ডাগআউটে দে লা ফুয়েন্তে। অন্য ডাগআউটে স্কালোনি।
আর মাঠের ভেতরেও সময় এঁকেছে আরেকটি বৃত্ত। একদিন একটি শিশুকে কোলে তুলে ছবি তুলেছিলেন লিওনেল মেসি। সেই শিশু আজ স্পেনের বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল। শিক্ষক ও ছাত্র নন তাঁরা। তবু সেই ছবির মধ্যেও যেন ছিল এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ফুটবলের অদৃশ্য উত্তরাধিকার। একদিন যে শিশু মেসির কোলে উঠেছিল, বিশ্বকাপের ফাইনালে আজ সেই ছেলেটিই দাঁড়াবে তাঁর প্রতিপক্ষ হয়ে।
ফাইনালের আগে স্কালোনি বলেছেন, শিক্ষকের সাফল্যে তিনি আনন্দিত। দে লা ফুয়েন্তে এই জায়গায় পৌঁছানোর যোগ্য। স্পেনের দলে তিনি এমন অনেক গুণ দেখতে পান, যা নিজের দলের মধ্যেও দেখতে চান।
তারপর হাসতে হাসতে বলেছেন, ফাইনাল শেষ হওয়ার আগে শিক্ষককে ফোন করবেন না।
কারণ শ্রদ্ধা থাকবে। বন্ধুত্বও থাকবে। কিন্তু খেলা শুরু হওয়ার পর কেউ কাউকে জায়গা ছেড়ে দেবেন না।
দে লা ফুয়েন্তে জানেন, তাঁর সাবেক ছাত্র কীভাবে একটি দলকে একসঙ্গে রাখেন। স্কালোনিও জানেন, তাঁর শিক্ষক কীভাবে তরুণদের বিশ্বাস করতে শেখান।
দুজনের দল গড়ার পদ্ধতির ভেতরেও মিল আছে। দুজনই তারকার চেয়ে দলকে বড় করে দেখেন। দুজনই মনে করেন, খেলোয়াড়ের পায়ের দক্ষতার পাশাপাশি মানুষের চরিত্রও গুরুত্বপূর্ণ। দুজনের দলই নিজেদের পরিবার বলে মনে করে।
হয়তো লাস রোজাসের সেই শ্রেণিকক্ষে স্কালোনি শুধু দুটি বিষয় শেখেননি। তিনি দেখেছিলেন, ফুটবলের পাঠ কীভাবে মানুষের পাঠ হয়ে ওঠে।
তবে শিক্ষকতার সার্থকতা।
[বিদেশি পত্র পত্রিকা অবলম্বনে]





