সিরাজগঞ্জের মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় একটাই নাম, হাজী মো. আব্দুস সাত্তার

Date:

spot_img

হানিফ তালুকদার

মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার নাম, পদবি কিংবা বিত্তবৈভবে নয়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় নিহিত থাকে তার কর্মে, মনুষ্যত্বে এবং অন্যের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতায়। পৃথিবীতে অনেক মানুষ সম্পদের প্রাচুর্যে বড় হন, কেউ কেউ প্রতিষ্ঠার উচ্চতায় পৌঁছান, কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক মানুষই আছেন, যাঁরা মানুষের ভালোবাসায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারেন। কারণ অর্থ দিয়ে প্রভাব বিস্তার করা যায়, কিন্তু হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হলে প্রয়োজন ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার এক অনন্য সমন্বয়। সিরাজগঞ্জের মানুষের কাছে হাজী মো. আব্দুস সাত্তার তেমনই এক পরিচিত নাম।

হাজী মো. আব্দুস সাত্তারকে বছরখানেক আগেও আমি চিনতাম না। চিনবই বা কী করে! সিরাজগঞ্জে আমার বসবাস মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময়। জন্ম এই শহরে হলেও কৈশোর ও যৌবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে যশোর ও ঢাকায়। ফলে জন্মভূমির সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক থাকলেও এখানকার মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের পরিধি ছিল সীমিত। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই পরিচয়ের জগৎ ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে।

তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ সাত-আট মাস আগে। অত্যন্ত ব্যস্ত একজন মানুষ। সেদিনও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসা মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। তাঁদের অধিকাংশই এসেছিলেন কোনো না কোনো সহযোগিতা কিংবা প্রত্যাশা নিয়ে। এক পর্যায়ে তাঁর সঙ্গে দেখা হলো, কথা হলো। তারপর পরিচয়ের সূত্র ধরে ধীরে ধীরে এক ধরনের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হলো। প্রায় ছয় মাস ধরে তাঁর সম্পাদনা ও প্রকাশনায় প্রকাশিত দৈনিক ‘যমুনার কথা’র সঙ্গে যুক্ত আছি। পত্রিকাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তাঁর কর্মজগৎ ও মানবিক কর্মকাণ্ডকে আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।

তবে প্রথম দেখাতেই একটি অদ্ভুত অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করে ছিল। তাঁর চেহারার সঙ্গে আমার প্রয়াত একমাত্র মামা মো. আব্দুস সাত্তার তালুকদারের আশ্চর্য রকমের মিল খুঁজে পেয়েছিলাম। আমার মামা অনেক আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। সব সময় সাদা জামা, প্যান্ট ও জুতা পরতে পছন্দ করতেন। হাজী আব্দুস সাত্তারের মধ্যেও যেন সেই একই রুচি ও ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলাম। সেই সাদৃশ্য থেকেই তাঁকে একসময় ‘মামা’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করি। বয়সের হিসাবে তিনি আমার চেয়ে আট বছরের ছোট হলেও সম্পর্কের এই সম্বোধনে বয়স কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
জীবনে কিছু সম্পর্ক রক্তের বন্ধনে তৈরি হয়, আবার কিছু সম্পর্ক তৈরি হয় অনুভূতির অদৃশ্য সেতুতে। হাজী আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে আমার সম্পর্কের সূচনাটিও তেমনই এক অনুভূতির মধ্য দিয়ে।
হাজী মো. আব্দুস সাত্তার ১৯৭২ সালের ২৭ আগস্ট সিরাজগঞ্জ শহরের ধানবান্ধি এলাকায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মো. জিন্নত আলী শেখ এবং মাতা মোছাম্মাৎ কমলা বেগম। জীবনের এই পর্যায়ে এসে তিনি তাঁর বাবা-মা দু’জনকেই হারিয়েছেন। অথচ মানুষের জীবনে পিতা-মাতার শিক্ষা, আদর্শ ও মূল্যবোধই অনেক সময় ভবিষ্যৎ পথচলার নীরব ভিত্তি হয়ে থাকে।
বর্তমানে তিনি দৈনিক ‘যমুনার কথা’র সম্পাদক ও প্রকাশক, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক। পাশাপাশি আব্দুস সাত্তার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের বাইরেও তাঁর আরেকটি পরিচিতি রয়েছে, আর তাহলো অনেক মানুষের কাছেই তিনি মানবতার ফেরিওয়ালা।
মানুষের জীবনের সার্থকতা কেবল নিজের জন্য কিছু অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং নিজের অর্জনের একটি অংশ অন্যের প্রয়োজন পূরণে ব্যয় করতে পারার মধ্যেই জীবনের গভীরতর তাৎপর্য নিহিত। এই দর্শন থেকেই ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবসেবামূলক উদ্যোগে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন ।

একটি শহরের সৌন্দর্য শুধু তার অট্টালিকা, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আলোকসজ্জায় নয়, শহরের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নাগরিক সচেতনতা এবং মানুষের জীবনযাপনের উপর। এই উপলব্ধি থেকেই হাজী আব্দুস সাত্তার সিরাজগঞ্জ শহরের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক নারী-পুরুষ স্বেচ্ছাসেবী পালাক্রমে পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। শহরের বিভিন্ন সড়ক, ড্রেন ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এই উদ্যোগের তাৎপর্য শুধু ময়লা-আবর্জনা অপসারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিক দায়িত্ববোধ ও সামাজিক অংশগ্রহণ এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। একটি শহর তখনই সত্যিকার অর্থে সুন্দর হয়ে ওঠে, যখন শহরের নাগরিকেরা নিজেদের শহরকে নিজের বাড়ির মতোই ভালোবাসতে শেখেন।

দারিদ্র্য মানুষের জীবনে শুধু অর্থের অভাব তৈরি করে না, অনেক সময় তা মানুষের আত্মবিশ্বাস, স্বপ্ন ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেও সংকুচিত করে দেয়। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অসহায় পরিবারগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেন। রমজান মাসে আব্দুস সাত্তার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সিরাজগঞ্জ পৌর পার্কের সামনে কয়েকশ’ অসহায় ও দুস্থ ক্ষুদ্র দোকানদারের মধ্যে চাল বিতরণ করা হয়। যাঁরা সামান্য পুঁজি নিয়ে প্রতিদিন জীবিকার সংগ্রামে নামেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ সামাজিক সহমর্মিতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, সহায়তা কেবল অভাবী মানুষের হাতে কিছু তুলে দেওয়া নয়, বরং তাঁদের জীবন সংগ্রামের প্রতি সম্মান জানানোও। মানবিকতার প্রকৃত সৌন্দর্য সেখানেই, যেখানে সাহায্যপ্রার্থী মানুষকে করুণার চোখে নয়, মর্যাদার চোখে দেখা হয়।

মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম হলো নিরাপদ পানি। অথচ নগরজীবনের ব্যস্ততায় অনেক সময় পথচারী, শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য বিশুদ্ধ পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
হাজী আব্দুস সাত্তারের উদ্যোগে সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার দিয়ারধানগড়া পোস্ট অফিস মোড়ে এক হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতার পানির ট্যাংক ও পানির কল স্থাপন করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করার এই উদ্যোগ আকারে ছোট মনে হলেও জনকল্যাণের বিবেচনায় এর গুরুত্ব অনেক। কারণ মানবসেবা সব সময় বড় কোনো আয়োজনের নাম নয়। কখনো এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি, কখনো ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে একবেলার খাবার, কখনো অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো,এসব ছোট ছোট কাজই মানুষের জীবনে বড় স্বস্তি হয়ে দেখা দেয়।

অসহায় মানুষের আশ্রয় ও নির্ভরতার জায়গা
প্রতি শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে শত শত অসহায় ও দরিদ্র মানুষ উপস্থিত হন। তিনি তাঁদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করেন, সমস্যার কথা শোনেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। মানুষের অভাব-অভিযোগ শোনার জন্য নিয়মিত সময় বের করে নেওয়াও এক ধরনের মানবিক দায়িত্ববোধের পরিচয়। শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার মধ্যেও রয়েছে গভীর মানবিকতা। কারণ অনেক সময় বিপন্ন মানুষ অর্থের পাশাপাশি একটু মনোযোগ, আশ্বাস ও সহমর্মিতাও প্রত্যাশা করেন।

তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য মানবিক বৈশিষ্ট্য হলো, সিরাজগঞ্জ শহর কিংবা আশপাশের এলাকায় কেউ মৃত্যুবরণ করলে তিনি জানাজায় অংশগ্রহণের চেষ্টা করেন। মানুষের জীবনের শেষ বিদায়ের মুহূর্তেও পাশে দাঁড়ানোর এই অভ্যাস তাঁর সামাজিক সম্পৃক্ততার একটি বিশেষ দিক।

শুধু তাই নয়, দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে একই জায়গায় বসে খাবার খাওয়া কিংবা ঘাসের ওপর বসে তাঁদের সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে তিনি সামাজিক দূরত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টা করেন। আমার কাছে এই দৃশ্যগুলোর একটি আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। কারণ মানুষের প্রকৃত উচ্চতা নির্ধারিত হয় না সে কত উঁচু আসনে বসে আছে, বরং নির্ধারিত হয় সে কত সহজে সাধারণ মানুষের কাছে নেমে আসতে পেরেছেন।

অসুস্থতা মানুষের জীবনে এক গভীর অসহায়ত্ব তৈরি করে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে তখন চিকিৎসার ব্যয় ও অনিশ্চয়তা পুরো পরিবারকে বিপর্যস্ত করে তোলে।

হাজী আব্দুস সাত্তার সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের খোঁজখবর নেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতার আশ্বাস দেন। অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের দুর্ভোগের কথা শোনা এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া মানবিক সমাজ গঠনের অন্যতম শর্ত।

জীবন বাঁচানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো রক্তদান। জরুরি মুহূর্তে এক ব্যাগ রক্ত একটি পরিবারের কাছে আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। বিশ্ব রক্তদান দিবস উপলক্ষে সিরাজগঞ্জের ইসলামিয়া সরকারি কলেজে স্বেচ্ছায় রক্তদান সংগঠন ‘হৃদয়ে রক্ত’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। তরুণদের স্বেচ্ছায় রক্তদানে উৎসাহিত করার এ ধরনের উদ্যোগ সমাজে মানবিক চেতনা বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।

ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিধান হলো যাকাত। এর অন্তর্নিহিত দর্শন হলো সম্পদের সুষম বণ্টন, দরিদ্রের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করা। যাকাত কেবল ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলন নয়, এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক অর্থনীতির গভীর শিক্ষা।

হাজী মো. আব্দুস সাত্তার সরকারি যাকাত ফান্ডে ১০ লাখ টাকার চেক অনুদান প্রদান করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দরিদ্র মানুষের কল্যাণে সম্পদ ব্যবহারের এই উদ্যোগ যাকাতের সামাজিক তাৎপর্যকে সামনে নিয়ে আসে।

এ ছাড়া বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা, এতিমখানা ও কবরস্থানের উন্নয়ন এবং মাটি ভরাটের কাজে তিনি আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে থাকেন। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক অবকাঠামোর উন্নয়নে তাঁর সম্পৃক্ততা প্রকাশ পায়।
একজন ব্যবসায়ী শুধু নিজের প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না। তাঁর ব্যবসা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং সমাজের নানা স্তরের মানুষের জীবিকার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। সেই বিবেচনায় ব্যবসায়িক সাফল্যের সঙ্গে সামাজিক দায়িত্ববোধ যুক্ত হলে একজন উদ্যোক্তার ভূমিকা আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক হিসেবে হাজী আব্দুস সাত্তার জেলার ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অন্যদিকে আব্দুস সাত্তার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। ব্যবসা, সামাজিক নেতৃত্ব ও মানব সেবার এই সমন্বয় তাঁর কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। তবে ব্যক্তির কর্মের যথার্থ মূল্যায়ন হওয়া উচিত তথ্য, ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা ও বাস্তব জনকল্যাণের ভিত্তিতে। কোনো উদ্যোগ কতটা প্রশংসিত হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই উদ্যোগ মানুষের জীবনে কতটা স্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারল। মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ডের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ।

দার্শনিকভাবে মানুষের জীবনকে বিচার করলে দেখা যায়, ব্যক্তিগত অর্জন একসময় সময়ের স্রোতে ম্লান হয়ে যায়, কিন্তু মানুষের কল্যাণে নিবেদিত কর্মের স্মৃতি দীর্ঘকাল বেঁচে থাকে। অর্থ-সম্পদ উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যাওয়া যায়, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে হয় নিজের আচরণ, দায়িত্ববোধ ও কর্মের মধ্য দিয়ে।
হাজী মো. আব্দুস সাত্তারের কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করে আমার কাছে যে বিষয়টি বিশেষভাবে প্রতিভাত হয়েছে, তা হলো, তিনি নিজের ব্যবসায়িক পরিচয়ের পাশাপাশি সামাজিক পরিচয়কেও গুরুত্ব দিতে চেষ্টা করছেন। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, খাদ্যসহায়তা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, রোগীদের খোঁজখবর নেওয়া, রক্তদানে উৎসাহিত করা, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে তিনি সমাজের বিভিন্ন প্রয়োজনের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন।

আমি তাঁকে খুব দীর্ঘদিন ধরে চিনি না। মাত্র কয়েক মাসের পরিচয়। কিন্তু মানুষের পরিচয় নির্ধারণের জন্য সব সময় দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় না, কখনো কখনো তার চারপাশের মানুষের সঙ্গে আচরণ, কর্মের পরিধি এবং বিপন্ন মানুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিই অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়।

সিরাজগঞ্জ আমার জন্মভূমি। এই শহরের মাটি, মানুষ ও ইতিহাসের সঙ্গে আমার এক গভীর আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই এই শহরের কোনো মানুষ যখন মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন, তখন ব্যক্তিগত ভালো লাগার পাশাপাশি জন্মভূমির প্রতি এক ধরনের গর্বও অনুভব করি।

আমার বিশ্বাস, একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো, তার উপস্থিতিতে কেউ যদি আশ্বস্ত হয়, তার সহযোগিতায় কোনো পরিবার যদি একটু স্বস্তি পায়, তার উদ্যোগে শহর যদি একটু পরিচ্ছন্ন হয়, তার সহমর্মিতায় কোনো বিপন্ন মানুষ যদি নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস খুঁজে পায়। তখন সেই মানুষটি তার পদবি দিয়ে নয়, মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া অনুভূতি দিয়েই স্মরণীয় হয়ে থাকে। জীবনের প্রকৃত সার্থকতা প্রাসাদ নির্মাণে নয়, মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার একটি স্থায়ী ঠিকানা নির্মাণে।

হাজী মো. আব্দুস সাত্তারের মানবিক ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলো আরও বিস্তৃত, সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করুক। তাঁর সামর্থ্য ও উদ্যোগে আরও অনেক মানুষের মুখে হাসি ফুটুক। ব্যক্তিগত পরিচয়ের সেই স্নেহময় সম্বোধন ‘মামা’র সঙ্গে যুক্ত হোক আরও অনেক মানুষের ভালোবাসা ও আস্থার সম্পর্ক। কারণ দিনশেষে মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় জায়গা করে নেওয়াই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। সিরাজগঞ্জের মানুষের ভালোবাসায় সেই অর্জনের পথেই এগিয়ে চলুন হাজী মো. আব্দুস সাত্তার।


লেখক পরিচিতি: হানিফ তালুকদার একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক ও কলামিস্ট। তিনি সিরাজগঞ্জ থেকে প্রকাশিত দৈনিক যমুনার কথা পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। সিরাজগঞ্জে জন্মগ্রহণ করলেও কৈশোর ও জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি যশোর ও ঢাকায় কাটিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি নিজ শহর সিরাজগঞ্জে ফিরে আসেন।তাঁর লেখালেখিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। মানুষের জীবন ও সমাজের নানা বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর লেখার মূল উপজীব্য।
এই বিশেষ ফিচারটি তাঁর ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং হাজি মো. আবদুস সাত্তারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় ও সান্নিধ্যের আলোকে রচিত।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

সিরাজগঞ্জের মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় একটাই নাম, হাজী মো. আব্দুস সাত্তার

হানিফ তালুকদার মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার নাম, পদবি কিংবা বিত্তবৈভবে...

খুলনায় তাঁতি দল নেতা হুমায়ুন কবিরকে কুপিয়ে হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা খুলনায় নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বসে থাকা অবস্থায় দুর্বৃত্তদের...

শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জে জেলে-বাওয়ালীদের মানববন্ধন, সুন্দরবনকে বনদস্যুমুক্ত করার দাবি

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি সুন্দরবনকে জলদস্যু ও বনদস্যুমুক্ত করার দাবীতে এবং...

বোরহানউদ্দিন প্রেসক্লাবের সাধারন সভা অনুষ্ঠিত

ভোলা প্রতিনিধি ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ...