
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান শিক্ষার্থী থেকে উদ্যোক্তা, তিন দশকের প্রবাসজীবনে ব্যবসা ও কমিউনিটি নেতৃত্ব, এবার NRB World-এর সভাপতি মো. সাহিদুজ্জামান টরিক
সিরাজুম মনিরা
চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেখান থেকে সিঙ্গাপুর। তারপর ব্যবসা, প্রবাসী কমিউনিটির নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশিদের প্রতিনিধিত্ব। মো. সাহিদুজ্জামান টরিকের তিন দশকের বেশি সময়ের পথচলাকে শুধু একজন প্রবাসী ব্যবসায়ীর সাফল্যের গল্পে সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন। তাঁর যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি উদ্যোক্তা সমাজের বেড়ে ওঠার একটি সময়ও।
১৯৯৫ সালে তিনি যখন সিঙ্গাপুরে যান, তখন দেশটিতে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে অল্প। ২০২৬ সালে সিঙ্গাপুরে নিজের ৩১ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতে গিয়ে টরিক জানান, এখন সেখানে বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়েছে। এই পরিবর্তনের মধ্যেই তিনি নিজেও গড়ে তুলেছেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, যুক্ত হয়েছেন ব্যবসায়ী সংগঠনে এবং বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগে।
শুরুটা চুয়াডাঙ্গায়
মো. সাহিদুজ্জামান টরিকের জন্ম চুয়াডাঙ্গায়। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ সোসাইটির প্রকাশিত পরিচিতিতে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি পাঁচ বছর চুয়াডাঙ্গা জেলা ছাত্রকল্যাণ সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
উচ্চশিক্ষার পর ১৯৯৫ সালে তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় সিঙ্গাপুরে। প্রতিষ্ঠিত অবস্থান নিয়ে সেখানে যাননি তিনি। কর্মজীবনের প্রথম দিকটি ছিল নিজের জায়গা তৈরি করার সময়।
সেই পথ ধরেই ২০০২ সালে ব্যবসায় প্রবেশ।
২০০২ সালে নিজের প্রতিষ্ঠান
সিঙ্গাপুরের কোম্পানি নিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী, Shahid Travel & Tours Pte Ltd ২০০২ সালের ২৩ ডিসেম্বর নিবন্ধিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যক্রম ভ্রমণ সংস্থা ও ট্যুর পরিচালনা। প্রতিষ্ঠানটি এখনও সক্রিয় কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত রয়েছে। সিঙ্গাপুরের পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্ট নিবন্ধনেও প্রতিষ্ঠানটির উপস্থিতি রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে তাঁর ব্যবসায়িক কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। বাংলাদেশ হাইকমিশন সিঙ্গাপুরের প্রকাশিত ট্রাভেল এজেন্সির তালিকায় ‘Shahid Group’ এর অধীনে Shahid Travel & Tours, Shahid Apartments, Shahid International, ABC Network ও Fahmi Singapore সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে।
এখানেই তাঁর গল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক স্পষ্ট হয়। বিদেশে গিয়ে শুধু চাকরি বা একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠার মধ্যে তাঁর কর্মকাণ্ড থেমে থাকেনি। পর্যায়ক্রমে ভ্রমণ, পর্যটন, সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্ট ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছে। NRB World এর নিজস্ব পরিচিতিতেও তাঁকে Shahid Group of Companies এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৮ সালে Shahid Travel & Tours সিঙ্গাপুরের Singapore 500 Enterprise Award এর Hospitality & Tourism বিভাগে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ছিল। ওই বছরের নিবন্ধিত পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকায় কোম্পানিটির নাম রয়েছে।
ব্যবসা থেকে প্রবাসী নেতৃত্বে
ব্যক্তিগত ব্যবসার পাশাপাশি সাহিদুজ্জামান টরিকের পরিচয়ের বড় অংশ হয়ে উঠেছে সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশি ব্যবসায়ী কমিউনিটি।
Bangladesh Business Chamber of Singapore, সংক্ষেপে BDCham, সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের অন্যতম সংগঠিত প্ল্যাটফর্ম। সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হয় ২০১০ সালের ১৬ আগস্ট। এর উদ্দেশ্যের মধ্যে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানো অন্যতম।
এই সংগঠনের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন টরিক। BDCham এর নিজস্ব ওয়েবসাইটে তাঁকে সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার বিষয়ে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ফেরদৌসী শাহরিয়ারের সঙ্গে BDCham প্রতিনিধিদের বৈঠকেও তিনি সংগঠনের সভাপতি হিসেবে বক্তব্য দেন।
এরও আগে তাঁর নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী মহলের নজরে আসে।
২০১৮ সালের জুলাইয়ে Singapore Business Federation, Enterprise Singapore, Singapore Indian Chamber of Commerce and Industry এবং BDCham যৌথভাবে বাংলাদেশে একটি ব্যবসায়ী মিশনের আয়োজন করে। ২৪টি কোম্পানি ও দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ৩৬ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সেই মিশনে অংশ নেন।
সিঙ্গাপুরের The Business Times এবং The Straits Times দুটিই সে সময় জানিয়েছিল, Singapore Business Federation এর চেয়ারম্যান এস এস তেওর সঙ্গে মিশনের নেতৃত্বে ছিলেন BDCham সভাপতি মো. সাহিদুজ্জামান। সফরটির লক্ষ্য ছিল ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যবসা এবং বিনিয়োগের নতুন সুযোগ খোঁজা।
একজন চুয়াডাঙ্গার মানুষের সিঙ্গাপুরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠার গল্প তাই এখানে একটি বৃহত্তর মাত্রা পায়। তিনি এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছান, যেখানে তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল নিয়ে আসার সঙ্গেও যুক্ত হয়।
৩১ বছরে বদলে যাওয়া সিঙ্গাপুর
২০২৬ সালের আগস্টে সিঙ্গাপুরের ৬১তম জাতীয় দিবস উপলক্ষে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন সাহিদুজ্জামান টরিক। সেখানে তিনি জানান, সিঙ্গাপুরে তাঁর বসবাসের বয়স ৩১ বছর।
তাঁর পর্যবেক্ষণে এই তিন দশকে সিঙ্গাপুর যেমন দ্রুত বদলেছে, তেমনি বদলেছে সেখানে বাংলাদেশিদের অবস্থানও। এক সময় হাতে গোনা বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থাকলেও এখন সংখ্যাটি ২৫০ ছাড়িয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সিঙ্গাপুরের উন্নয়নে বাংলাদেশি শ্রমজীবী মানুষের অবদানের কথাও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যে ব্যবসায়ী সমাজের দায়িত্ব হিসেবে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক সেতু তৈরির বিষয়টি এসেছে।
এই জায়গাটিই টরিকের প্রবাসজীবনের আরেকটি পরিচয় তৈরি করেছে। একদিকে নিজের ব্যবসা, অন্যদিকে প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সমাজকে মূলধারার বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা।
এবার NRB World এর নেতৃত্বে
২০২৬ সালে তাঁর আন্তর্জাতিক প্রবাসী নেতৃত্বে যুক্ত হয়েছে নতুন অধ্যায়।
NRB World এর ঘোষিত ২০২৬ থেকে ২০২৮ মেয়াদের নির্বাহী কমিটিতে মো. সাহিদুজ্জামান সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সংগঠনটির নিজস্ব ওয়েবসাইটেও ২০২৬ থেকে ২০২৮ মেয়াদের সভাপতি হিসেবে তাঁর নাম রয়েছে। একই কমিটিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি উদ্যোক্তা, পেশাজীবী ও কমিউনিটি নেতারা রয়েছেন।
এই দায়িত্বের গুরুত্ব শুধু একটি নতুন পদ পাওয়ার মধ্যে নয়। সিঙ্গাপুরে তিন দশকের ব্যবসা ও সংগঠনের অভিজ্ঞতার পর এবার তাঁর কাজের পরিসর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীদের একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক পর্যন্ত বিস্তৃত হলো।
প্রবাসীদের বিনিয়োগ, জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার আলোচনা দীর্ঘদিনের। এই প্রেক্ষাপটে NRB World এর নেতৃত্ব তাঁর সামনে নতুন দায়িত্বও তৈরি করেছে।
শিকড় চুয়াডাঙ্গায়
দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকলেও তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে চুয়াডাঙ্গার নামটি থেকে গেছে।
সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ সোসাইটি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্রবাসী সংগঠনের পরিচিতি পর্যন্ত তাঁর জন্মস্থান হিসেবে উঠে এসেছে চুয়াডাঙ্গার নাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে চুয়াডাঙ্গার শিক্ষার্থীদের সংগঠনে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্যেও ছিল সেই যোগসূত্র।
বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশির সাফল্য তখনই আলাদা তাৎপর্য পায়, যখন সেটি ব্যক্তিগত সমৃদ্ধির সীমা অতিক্রম করে প্রতিষ্ঠান, নেটওয়ার্ক এবং দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ তৈরির জায়গায় পৌঁছায়।
মো. সাহিদুজ্জামান টরিকের পথচলার উল্লেখযোগ্য দিক এখানেই।
চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুর, নিজের প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব, তারপর বিশ্বজুড়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি প্ল্যাটফর্মের সভাপতির দায়িত্ব।
৩১ বছরের সেই যাত্রা এখনও চলছে।





