
সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে ২০২৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৪৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং এটিই নাকি দেশের সড়কে সর্বোচ্চ মৃত্যুর বছর। এই তথ্য সত্য হলে তা নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা, নীতিনির্ধারণের গুণমান এবং নাগরিক সুরক্ষার প্রতি দায়িত্ববোধের নির্মম পরিমাপ। আর যদি তথ্যটি আংশিক বা খণ্ডিত হয়, তবে সংকট আরও ভয়াবহ—কারণ সড়ক নিরাপত্তার মতো জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানিই না, কোথায় কত মানুষ মারা যাচ্ছে, কেন মারা যাচ্ছে, এবং কোন সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবে কতটা কাজ করছে। সংখ্যাটি ৫ হাজার ৪৯০ হোক কিংবা কোনো বেসরকারি পর্যবেক্ষণে আরও বেশি—মূল কথা একটাই: সড়ককে আমরা মানুষের জন্য নিরাপদ করে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছি এবং এই ব্যর্থতার দায় কোনো এক বছরের বা কোনো এক সরকারের একক নয়; এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অব্যবস্থার ফল।
খবরে আরেকটি দিক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই বছরে সর্বোচ্চ প্রাণহানির এই চিত্র সামনে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, অথচ বিশ্লেষকদের মতে ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনই ছিল এমন এক মোড়, যেখান থেকে রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে সড়ক ব্যবস্থাপনা সংস্কারের একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সে আন্দোলনের সময়ে তরুণদের ক্ষোভ ছিল কেবল চালকের বেপরোয়া আচরণ বা একটি-দুটি দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে নয়। তাদের ক্ষোভ ছিল পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। লাইসেন্সের অস্বচ্ছতা, ফিটনেসের নামে কাগুজে ছাড়পত্র, রুট পারমিট ও স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণে প্রভাবশালী স্বার্থ, আইন প্রয়োগে দ্বৈতনীতি এবং চূড়ান্তভাবে মানুষের জীবনের চেয়ে “চলমান ব্যবস্থার সুবিধাভোগ”কে বড় করে দেখার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। আন্দোলনের পর আইন পাস, টাস্কফোর্স গঠন—এসব পদক্ষেপের কথা শোনা গেছে। কিন্তু আট বছর পরে মৃত্যুসংখ্যা যদি দ্বিগুণের বেশি বেড়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে: আইন কি কাগজে আছে, নাকি রাস্তায় আছে? টাস্কফোর্স কি ফাইলের পাতায় আছে, নাকি মাঠের বাস্তবতায় আছে?
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল—এই তুলনাটি শুধু সময়ের ব্যবধান দেখায় না বরং দেখায় যে আমাদের নীতিগত প্রতিক্রিয়া কতটা অপ্রতুল ছিল। কারণ সড়ক দুর্ঘটনা কেবল “ভাগ্য” বা “অবহেলা” দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; এটি পূর্বানুমেয়, প্রতিরোধযোগ্য এবং ব্যবস্থা-নির্ভর। সড়ক নকশা, যানবাহনের মান, চালকের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিংয়ের শুদ্ধতা, গতি নিয়ন্ত্রণ, ওভারলোডিং, আইন প্রয়োগ, জরুরি চিকিৎসা—সবকিছু মিলেই দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর গতি নির্ধারণ করে। ফলে যখন মৃত্যুর রেখা উর্ধ্বমুখী থাকে, তখন এটি প্রমাণ করে যে আমাদের ব্যবস্থা একই সঙ্গে বহু জায়গায় ব্যর্থ হচ্ছে—কখনো নিয়ন্ত্রণে, কখনো তদারকিতে, কখনো ন্যূনতম শৃঙ্খলায়, আবার কখনো জবাবদিহিতে।
এর সঙ্গে একটি বড় বাস্তবতা হলো তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সমন্বয়ের অভাব। একেক সংস্থার হিসাব একেক রকম হওয়া মানেই নীতিনির্ধারণের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে থাকা। পুলিশ রিপোর্ট, হাসপাতালের মৃত্যু-তথ্য, হাইওয়ে পুলিশের রেকর্ড, বিআরটিএর ডাটাবেজ, গণমাধ্যমভিত্তিক পর্যবেক্ষণ—এসবের মধ্যে সংজ্ঞা, রিপোর্টিং পদ্ধতি ও সময়সীমার পার্থক্য থাকলে প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যায়। নীতি ও বাজেটের সিদ্ধান্ত যখন এই বিভ্রান্তির ভেতর তৈরি হয়, তখন তা কার্যকর হওয়ার বদলে অনেক সময় প্রতীকী হয়ে পড়ে। সড়ক নিরাপত্তার প্রথম শর্ত হলো সত্য জানা—একটি সমন্বিত জাতীয় ক্র্যাশ ডাটাবেজ, যেখানে দুর্ঘটনা, আহত, মৃত্যু, যানবাহনের ধরন, স্থান, সময়, কারণ—সব তথ্য একই মানদণ্ডে নথিভুক্ত হবে এবং তা নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হবে। কারণ তথ্য যত গোপন বা অস্পষ্ট থাকবে, জবাবদিহি তত দুর্বল হবে; আর জবাবদিহি দুর্বল হলে পরিবর্তনও হয় না।
সহযোগী পত্রিকার খবরে যে অভিযোগটি এসেছে—অন্তর্বর্তী সরকার পরিবহন খাত সংস্কারের সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারেনি—সেটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্তর্বর্তী সরকার সাধারণত তুলনামূলক কম রাজনৈতিক বোঝা নিয়ে “কঠিন সিদ্ধান্ত” নিতে পারে—এমন প্রত্যাশা থাকে। সড়ক পরিবহন খাতে কঠিন সিদ্ধান্ত মানে কোনো অলৌকিক প্রকল্প নয়; বরং পুরোনো চক্র, অনিয়ম ও সুবিধাভোগী কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক দৃঢ়তা দেখানো। লাইসেন্স ও ফিটনেসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান, রুট পারমিট ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, বাস-মিনিবাসের রুট র্যাশনালাইজেশন, গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার, হাইওয়ে এনফোর্সমেন্ট শক্ত করা, ওভারলোডিং বন্ধে কার্যকর ও ধারাবাহিক অভিযান। এসবই সংস্কারের বাস্তব রূপরেখা। কিন্তু এগুলো করতে গেলে মুখোমুখি হতে হয় স্বার্থের দেয়ালের সঙ্গে। সেই দেয়াল ভাঙতে না পারলে আইন থাকে, মৃত্যু বাড়ে; পরিকল্পনা থাকে, শৃঙ্খলা ফেরে না।
তবে দায় কেবল “আইন না মানা” দিয়ে শেষ করা ঠিক নয়। আইন প্রয়োগের ধরণও বড় প্রশ্ন। যাকে ধরা হয়, তাকে ছেড়ে দেওয়া। যাকে ছাড় দেওয়া হয়, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া—এমন দ্বৈতনীতি সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনভীতি নয় বরং আইন নিয়ে অনীহা তৈরি করে। নিরাপদ সড়ক মানে শুধু জরিমানা বাড়ানো নয়। মানে ধারাবাহিক নজরদারি, ন্যায্য প্রয়োগ এবং এমন ব্যবস্থা যেখানে অনিয়ম করা কঠিন হয়ে যায়। গতি নিয়ন্ত্রণে ক্যামেরা-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় জরিমানা, ফিটনেস ও লাইসেন্সে ডিজিটাল ট্র্যাকিং, রুটে গাড়ির সময়সূচি ও লেন শৃঙ্খলা, চালকের প্রশিক্ষণ-রিফ্রেশার কোর্স—এসবের সমন্বয় ছাড়া কেবল মাঝে মাঝে অভিযান দিয়ে স্থায়ী পরিবর্তন হয় না। আর দুর্ঘটনার পর ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত না হলে মৃত্যুর হার কমানোও কঠিন। সুতরাং সড়ক নিরাপত্তা একদিকে শৃঙ্খলা, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা—দুইয়ের সমান্তরাল লড়াই।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলো—আমরা সড়কে মৃত্যুকে ধীরে ধীরে “স্বাভাবিক” বলে মেনে নিচ্ছি। প্রতিটি দুর্ঘটনার খবর দুইদিন আলোচনায় থাকে, তারপর আমরা অন্য খবরে চলে যাই। কিন্তু নিহতের পরিবার থামে না; তাদের জন্য রাষ্ট্রের কোনো ‘রিসেট বাটন’ নেই। এই জায়গায় সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ ও ভিকটিম সাপোর্ট ব্যবস্থাও মানবিক রাষ্ট্রের পরীক্ষার ক্ষেত্র। দুর্ঘটনার শিকার পরিবার যেন থানায়-হাসপাতালে-দপ্তরে দৌড়াতে দৌড়াতে নিঃস্ব না হয়ে যায়; রাষ্ট্রই যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সহায়তা পৌঁছে দেয়—এটা কেবল সহানুভূতি নয়, ন্যূনতম ন্যায়বিচার।
অতএব ২০২৫ সাল “সড়কে সর্বোচ্চ মৃত্যুর বছর”—এই শিরোনামের ভেতরে আসল বার্তা হলো: আমরা যে ব্যবস্থায় চলছি, তা মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে পারেনি। সরকার যেই থাকুক, দায়িত্ব পাল্টায় না। সড়ককে নিরাপদ করতে হলে প্রথমে সত্যকে স্বীকার করতে হবে, তারপর তথ্যকে এক মানদণ্ডে আনতে হবে, এরপর আইন প্রয়োগকে ধারাবাহিক ও ন্যায্য করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত পরিবহন খাতের ভেতরে গেঁড়ে বসা অনিয়ম-স্বার্থ-অদক্ষতার কাঠামো ভাঙতে হবে। না হলে প্রতিবছরই আমরা নতুন করে শিরোনাম লিখব—“এ বছরই সর্বোচ্চ মৃত্যু”—আর বাস্তবে বদলাবে শুধু সংখ্যা, বদলাবে না মানুষের ভাগ্য।





