‘ব্রিজোত উঠলে নড়ে, কখন যে ভাঙ্গি পড়ি যায় আল্লায় জানে’

Date:

spot_img

তারাগঞ্জে ৩৫ বছরের পুরোনো সেতুতে ঝুঁকি নিয়ে ২৫ হাজার মানুষের চলাচল


রংপুর ব্যুরো

‎‘ব্রিজোত উঠলে নড়ে, কখন যে ভাঙ্গি পড়ি যায় আল্লায় জানে।’ রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের শাইলবাড়ি গ্রামের সরমংলা নদীর ওপর নির্মিত জরাজীর্ণ সেতু নিয়ে এভাবেই আতঙ্কের কথা জানালেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রায় ৩৫ বছর আগে নির্মিত সেতুটির রেলিং ভেঙে গেছে, পিলারে দেখা দিয়েছে ফাটল, খসে পড়েছে পলেস্তারা। কোথাও কোথাও বেরিয়ে পড়েছে লোহার রড। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সেতুটি এখন পরিণত হয়েছে মরণফাঁদে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর জনপ্রতিনিধিদের কাছে সেতুটি সংস্কার বা নতুন করে নির্মাণের দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ভোটের সময় প্রতিশ্রুতি মিললেও ভোট শেষ হলে আর খবর থাকে না। ফলে ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন সেতুটি পার হচ্ছেন আশপাশের অন্তত ১০ গ্রামের মানুষ।

‎সরেজমিনে দেখা যায়, শাইলবাড়ি, ভীমপুর ও ডাংগাপাড়া গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে সরমংলা নদী। নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ৯০ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৩ ফুট প্রস্থের পুরোনো সেতুটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। সেতুর দুই পাশের নিরাপত্তা রেলিংয়ের অধিকাংশই ভেঙে গেছে। কোথাও রেলিংয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। পিলারের পলেস্তারা খসে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে রড। সেতুর ওপরের অংশে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় গর্ত। সামান্য ভারী যানবাহন চলাচলের সুযোগও নেই। মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল ছাড়া অন্য যানবাহন চলাচল করতে গেলেই তৈরি হয় বাড়তি ঝুঁকি। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ সেতুই আশপাশের প্রায় ১০ গ্রামের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান পথ। প্রতিদিন স্কুল-কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ সেতু ব্যবহার করেন। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ২৫ হাজার মানুষ কোনো না কোনোভাবে সেতুটির ওপর নির্ভরশীল।

‎ষাটোর্ধ্ব কৃষক জহুরুল ইসলাম শাইলবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভোগের কথা কেউ শুনে না। সবাই শুধু ভোটের সময় এসে দেখে যায়। গত ১৫-১৬ বছরে বহুবার ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটির সংস্কারের জন্য এমপি, চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে হাত জোর করা হয়েছে। সবাই শুধু আশ্বাস দিয়েছে—এটা করবে, ওটা করবে। কিন্তু কিছুই করা হয়নি। এখন মাঝে মধ্যে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটলেও ছোট-বড় সবাই আতঙ্ক নিয়েই সেতু দিয়ে চলাচল করছে। কবে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে, কেউ জানে না।’

‎স্থানীয় মাদরাসার শিক্ষক এশরামুল হক বলেন, ‘ব্রিজটা দিয়ে ঠিকমতো চলাচল করা যায় না। রিকশা-ভ্যান, মাইক্রো, অটো চলে না। ব্রিজ কেন বানাইছে? একদম চিকন।’ ডাংগাপাড়া গ্রামের লোকমান হোসেন বলেন, ‘ব্রিজোত উঠলে নড়ে, কখন যে ভাঙ্গি পড়ি যায় আল্লায় জানে। ব্রিজের রেলিংগুলা ভাঙ্গি গেইছে। খুঁটিগুলাতো ফাটি গেইছে।’

‎স্থানীয় সংবাদকর্মী দিপক রায় বলেন, সেতুটির বেহাল অবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন কৃষক ও কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। আশপাশের গ্রামের কৃষকরা ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য সহজে হাট-বাজারে নিতে পারেন না। ঝুঁকির কারণে ভ্যান ও অটোরিকশার চালকরাও অনেক সময় সেতুটি পার হতে চান না। ফলে কৃষকদের বিকল্প ও দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হয়। এতে সময়ের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে।

‎স্থানীয়রা জানান, সেতুটি সরু হওয়ায় কোনো রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও অ্যাম্বুলেন্স বা মাইক্রোবাস সেতু পার হতে পারে না। জরুরি প্রয়োজনে রোগী ও স্বজনদের পড়তে হয় চরম দুর্ভোগে। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বাড়লে সেতুটি দিয়ে চলাচলের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায় বলে জানান তারা।

‎শুধু যোগাযোগের ক্ষেত্রেই নয়, সেতুটির কারণে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়ছে। উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে কৃষকদের। শিক্ষার্থীদেরও প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে সেতু পার হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। সেতুর কোনো অংশে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিলে কয়েকটি গ্রামের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

‎এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি সংস্কারের দাবি জানানো হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। সাময়িকভাবে কোনো অংশ মেরামত করা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফলে বর্তমানে সেতুটির বিভিন্ন অংশ আবারও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

‎এ বিষয়ে তারাগঞ্জ উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী নাফিউর রহমান বলেন, ‘সেতুটির জরাজীর্ণ অবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পুনর্নির্মাণের জন্য জেলা পর্যায়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বাজেট ও নতুন প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত স্থায়ী সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হবে।’

‎তবে কবে নাগাদ নতুন সেতুর কাজ শুরু হতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি। স্থানীয়দের দাবি, নতুন সেতু নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত অন্তত ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করা হোক। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে দ্রুত একটি প্রশস্ত ও টেকসই সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হোক। তাদের আশঙ্কা, বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরে অনুশোচনা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

তিন শতাধিক বাস, হাজারো যাত্রী,বেহাল টার্মিনালে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

বাগেরহাট প্রতিনিধি পদ্মা সেতু চালুর পর বাগেরহাট থেকে দূরপাল্লার বাস...

সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার, ১ জেলে কারাগারে

কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি সুন্দরবনের খাশিটানা বন টহল ফাঁড়ির অধিনস্থ...

‘ব্রিজোত উঠলে নড়ে, কখন যে ভাঙ্গি পড়ি যায় আল্লায় জানে’

তারাগঞ্জে ৩৫ বছরের পুরোনো সেতুতে ঝুঁকি নিয়ে ২৫ হাজার...

‎তারাগঞ্জে ৩৫ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক

‎ ‎রংপুর ব্যুরো ‎ ‎রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় ৭৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে...