
আলী কদর পলাশ
প্রিয় পাঠক,
লুরদেস হেরেদিয়া তখন ১৭ বছরের এক মেক্সিকান কিশোরী। পরে তিনি সাংবাদিক হন, বর্তমানে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন তিনি। সেদিন আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘ঈশ্বরের হাত’ গোল এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন হেরেদিয়া। চার দশক পর সেই দিনের স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন তিনি।
সেদিন অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না তাদের। বাবার এক বন্ধু হঠাৎ দুটি টিকিট দিয়ে দেন। ফকল্যান্ড যুদ্ধের রেশ তখনও কাটেনি। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা হতে পারে—এই ভেবে তাঁর বাবা কিছুটা শঙ্কিত ছিলেন। কিন্তু মা সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাননি।
লুরদেস অবশ্য ফুটবল দেখতে নয়, যেন একটি বড় উৎসবে যাচ্ছেন—এমন প্রস্তুতি নিয়েই বেরিয়েছিলেন। স্টেডিয়ামে ঢুকে তিনি অভিভূত হয়ে যান। চারদিকে পতাকা, গান, মুখে রঙ মাখা সমর্থক আর উৎসবের উন্মাদনা। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব মানুষ যেন এক জায়গায় এসে মিলিত হয়েছে।
খেলা শুরু হলেও মাঠের চেয়ে দর্শকদের প্রতিই ছিল তাঁর বেশি মনোযোগ। ‘লা ওলা’ বা মেক্সিকান ঢেউয়ের সঙ্গে হাততালি দিচ্ছিলেন, হাসছিলেন, আনন্দ করছিলেন।
হঠাৎ পুরো স্টেডিয়াম উত্তেজনায় ফেটে পড়ল।
আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সঙ্গে লাফিয়ে উঠেছেন। বল জালে জড়িয়ে গেছে। প্রথমে অনেকের মতো তিনিও ভেবেছিলেন, এটি একটি সাধারণ হেড।
কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই চারদিকে শুরু হলো তর্ক-বিতর্ক।
পাশের এক দর্শক তাঁকে জানালেন, ম্যারাডোনা নাকি মাথা নয়, হাত দিয়ে বল জালে পাঠিয়েছেন। অথচ রেফারি সেটি দেখেননি।
তখনও কেউ বুঝতে পারেনি, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত গোলগুলোর একটি জন্ম নিয়েছে। পরে ম্যারাডোনা নিজেই গোলটির নাম দেন ‘ঈশ্বরের হাত’।
তবে লুরদেস হেরেদিয়ার স্মৃতিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে অন্য একটি দৃশ্য।
প্রথম গোল নিয়ে যখন পুরো স্টেডিয়াম আলোচনা করছে, তখন মাত্র চার মিনিট পর বল পেয়ে দৌড় শুরু করেন ম্যারাডোনা। নিজের অর্ধ থেকে তিনি একে একে কাটিয়ে যান ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের। পুরো স্টেডিয়াম যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে ছিল।
তারপর বলটি জালে।
অ্যাজটেকা বিস্ফোরিত হলো উল্লাসে।
হেরেদিয়া পরে লিখেছেন, প্রথম গোলের সময় যেখানে বিভক্ত ছিল দর্শকসারি, সেখানে দ্বিতীয় গোলটির সৌন্দর্য সবাইকে এক করে দিয়েছিল। এমনকি কাছাকাছি বসা কিছু ইংলিশ সমর্থককেও তিনি হাততালি দিতে দেখেছিলেন।
সেই মুহূর্তেই তিনি বুঝেছিলেন, মানুষ কেন ফুটবলকে এত ভালোবাসে।
ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে জয় পায়। কিন্তু হেরেদিয়ার মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছিল অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম নিজেই। বহু বছর পরও তাঁর কাছে সেই বিকেলের সবচেয়ে বড় স্মৃতি কোনো বিতর্ক নয়।
তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় স্মৃতি সেই দ্বিতীয় গোল।
যে গোলটিকে অনেকেই ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বলে। যে গোলটি প্রমাণ করেছিল, কখনো কখনো একটি মুহূর্তই একজন খেলোয়াড়কে কিংবদন্তিতে পরিণত করতে যথেষ্ট।
চার দশক পরও তাই ‘ঈশ্বরের হাত’-এর গল্প বলা হয়। কিন্তু যারা সেদিন অ্যাজটেকায় ছিলেন, তাদের অনেকের মতো লুরদেস হেরেদিয়ার মনেও আজও বেশি উজ্জ্বল হয়ে আছে আরেকটি ছবি—বল পায়ে একা ছুটে চলা ম্যারাডোনা, আর স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা একটি ।
[বিদেশি পত্র পত্রিকা অবলম্বনে]
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬