আলী কদর পলাশ
প্রিয় পাঠক,
বিশ্বকাপের মানচিত্রে বাংলাদেশের কোনো নাম নেই।
মেক্সিকো, কানাডা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে না। জাতীয় সংগীত বাজছে না। মাঠে নামছেন না কোনো বাংলাদেশি ফুটবলার।
তবু বিশ্বকাপ এলেই পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ বাংলাদেশের কথা বলে।
কেন?
কারণ পৃথিবীতে খুব কম দেশই আছে, যারা অন্যের ফুটবলকে এতটা নিজের করে নিতে পারে।
সম্প্রতি স্পেনের প্রভাবশালী দৈনিক এল পাইস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। শিরোনামটি ছিল বেশ চমকপ্রদ। তাদের ভাষায়, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়তো আর্জেন্টিনার জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
হিসাবটি নিয়ে তর্ক থাকতে পারে।
কিন্তু দৃশ্যটি নিয়ে নয়।
বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ বদলে যায়।
ছাদে ছাদে পতাকা ওঠে।
চায়ের দোকানে তর্ক শুরু হয়।
রাতভর খেলা দেখে সকালে লাল চোখে অফিসে যায় মানুষ।
যেন হাজার মাইল দূরের কোনো টুর্নামেন্ট নয়, নিজেদেরই জাতীয় উৎসব।
তবে একটি কথা শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো।
বাংলাদেশ কখনোই শুধু আর্জেন্টিনার দেশ ছিল না।
এই দেশের ফুটবলপ্রেম বহু রঙের।
একসময় পেলের গল্প শুনে মানুষ ব্রাজিলের প্রেমে পড়েছে। পরে এসেছে রোমারিও, বেবেতো, রোনালদো, রোনালদিনহো, নেইমার। বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবার এখনও হলুদ-সবুজ পতাকার ঘাঁটি।
আবার জার্মানির সমর্থক আছে।
ইংল্যান্ডের সমর্থক আছে।
আজকের প্রজন্মে পর্তুগালের অনেক ভক্ত তৈরি হয়েছে শুধু ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর জন্য।
আরও আগে, ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে রজার মিলার হাসি আর কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে নাচ দেখে অনেক বাংলাদেশি ক্যামেরুনের সমর্থক হয়ে গিয়েছিল।
ফুটবলের এই বৈচিত্র্যই বাংলাদেশের সৌন্দর্য।
কিন্তু তারপরও গত এক যুগে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে।
আর্জেন্টিনা যেন ধীরে ধীরে অন্য সবার চেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে একজন মানুষের কারণে।
তার নাম মেসি।
আসলে বাংলাদেশের মানুষ শুধু মেসির গোল দেখে না।
তারা তাঁর গল্পও দেখে।
ছোটবেলায় শারীরিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করা এক কিশোর।
বারবার ব্যর্থতার পরও হাল না ছাড়া এক ফুটবলার।
সমালোচনা, হতাশা আর পরাজয় পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জেতা এক মানুষ।
হয়তো এই কারণেই মেসি বাংলাদেশের মানুষের কাছে শুধু একজন খেলোয়াড় নন।
তিনি এক ধরনের অনুপ্রেরণা।
এল পাইস–এর প্রতিবেদনে ঢাকার ৩২ বছর বয়সী মোহাম্মদ শিবলী বলেছেন, তিনি ফুটবল দেখা শুরু করার পর থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থক। কারণ একজন মানুষ—মেসি।
আরেক সমর্থক রাসেল সাজ্জাদ বলেছেন, ২০২২ বিশ্বকাপেও তিনি আর্জেন্টিনার পাশে ছিলেন, এবারও আছেন। তাঁর আশা, আর্জেন্টিনা আবারও শিরোপা জিতবে।
সবচেয়ে মজার কথাটি বলেছেন ১৮ বছর বয়সী ইয়াসিন আরাফাত।
তিনি জানিয়েছেন, পাঁচ বছর বয়স থেকেই তিনি আর্জেন্টিনার সমর্থক।
কেন?
কারণ তাঁর বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক।
তাঁর বন্ধুরা আর্জেন্টিনার সমর্থক।
পরিবারের সবাই আর্জেন্টিনার সমর্থক।
অর্থাৎ সমর্থনটি আর ব্যক্তিগত পছন্দ নয়।
এটি এখন পারিবারিক ঐতিহ্য।
এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে যাওয়া এক আবেগ।
বাংলাদেশি লেখক ও ক্রীড়া বিশ্লেষক রাজিব হাসানও এল পাইস–কে বলেছিলেন, মেসির মধ্যে মানুষ এমন একজনকে খুঁজে পায়, যিনি সবকিছু জয়ের পরও নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পান না।
প্রায় চল্লিশ বছর বয়সেও তিনি নতুন স্বপ্নের পেছনে ছুটছেন।
রাজিবের মতে, এই কারণেই মেসি শুধু ফুটবলার নন, তিনি অনেক মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
হয়তো এ কারণেই ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জেতার পর বিশ্বের অনেক সংবাদমাধ্যম বিস্মিত হয়েছিল।
বুয়েনস আইরেসে উৎসব হবে, সেটি স্বাভাবিক।
কিন্তু ঢাকা কেন জেগে থাকবে?
চুয়াডাঙ্গা কেন আতশবাজি ফুটাবে?
বরিশাল, সিলেট কিংবা রংপুরে কেন মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে?
উত্তরটি আসলে খুব সহজ।
ফুটবল কখনো শুধু ফুটবল নয়।
এটি স্মৃতি।
এটি পরিবার।
এটি বন্ধুত্ব।
এটি পরিচয়েরও অংশ।
বাংলাদেশের লাখো মানুষের কাছে আর্জেন্টিনা আজ সেই পরিচয়েরই একটি নাম।
তাই বিশ্বকাপের কোনো রাতে যখন আর্জেন্টিনা মাঠে নামে, তখন শুধু দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশ খেলে না।
তার সঙ্গে জেগে থাকে আরেকটি দেশও।
যে দেশের মানুষ স্প্যানিশ জানে না।
বুয়েনস আইরেস দেখেনি।
পাম্পাসের ঘাসে কখনো হাঁটেনি।
তবু মেসির জয়ে আনন্দে ভেসে যায়।
আর পরাজয়ে মন খারাপ করে।
পৃথিবীর মানচিত্রে আর্জেন্টিনা একটাই।
কিন্তু ফুটবলের মানচিত্রে হয়তো দুটি।
একটি দক্ষিণ আমেরিকায়।
আরেকটি বঙ্গোপসাগরের তীরে।
মেসির আরেক দেশ।
[বিদেশি পত্র পত্রিকা অবলম্বনে]
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬