আলী কদর পলাশ
প্রিয় পাঠক
বিশ্বকাপের মরশুম এলেই কিছু পুরোনো গল্প নতুন করে ডানা মেলে। কোনো গল্প রাজকীয় জয়ের, কোনোটি বুকভাঙা পরাজয়ের। কিন্তু কিছু গল্প এমনও থাকে, যার সত্য-মিথ্যার সীমানা আজও কুয়াশায় ঢাকা।
এটি তেমনই এক গল্প। শুরু হয়েছিল একটা পানির বোতল দিয়ে, যার শেষ অধ্যায় আজও লেখা হয়নি।

সময়টা ১৯৯০ সাল। ইতালির বিশ্বকাপ। তুরিনের স্তাদিও দেল আলপিতে মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী—ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। দ্বিতীয় রাউন্ডের নকআউট পর্ব, যার অর্থ—জিতলে টিকে থাকা, হারলে বিদায়।
ম্যাচের শুরু থেকেই ব্রাজিলের দাপট। আক্রমণের পর আক্রমণে তারা আর্জেন্টিনাকে কোণঠাসা করে ফেলেছিল। পোস্ট কাঁপানো শট, একের পর এক সুযোগ হাতছাড়া—মাঠে উপস্থিত সবারই মনে হচ্ছিল, ব্রাজিলের গোল পাওয়া স্রেফ সময়ের ব্যাপার।
কিন্তু ফুটবল তো শুধু পায়ের খেলা নয়, কখনো কখনো তা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের রূপও নেয়।
ম্যাচের ৩৯তম মিনিটে খেলা থামল। আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার পেদ্রো ত্রোগ্লিও চোট পেয়ে মাঠে পড়ে আছেন। চিকিৎসকেরা মাঠে ঢুকলেন, সেই সুযোগে সাইডলাইনে ফুটবলারদের জন্য নিয়ে আসা হলো পানির বোতল।
তৃষ্ণার্ত ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার ব্রাঙ্কো এগিয়ে গেলেন আর্জেন্টিনার সাইডলাইনের দিকে। আর্জেন্টিনার স্টাফদের হাত থেকে একটি সবুজ রঙের বোতল নিয়ে পানি পান করলেন তিনি।
ব্যস, রহস্যের সূত্রপাত সেখানেই।
ম্যাচের পর এবং পরবর্তী বছরগুলোতে ব্রাঙ্কো লাগাতার অভিযোগ করতে থাকেন, সেই পানি খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর শরীর অস্বাভাবিক রকমের ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে, চোখ জুড়ে নেমে আসে ঘুম। মাঠের গতি আর নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন তিনি।
ঠিক এর ১০ মিনিট পরেই ঘটে সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। মাঝমাঠ থেকে ম্যারাডোনার সেই জাদুকরী ড্রিবলিং, ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে কানিজিয়াকে দেওয়া সেই নিখুঁত পাস এবং গোল! ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল। কিন্তু ব্রাঙ্কোর দাবি ছিল, ম্যারাডোনাকে আটকানোর দায়িত্বে থাকা তিনিই তখন ড্রাগের প্রভাবে মাঠে প্রায় অচেতন ছিলেন।
শুরুতে আর্জেন্টিনা এই অভিযোগকে স্রেফ হারের অজুহাত বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। ফিফাও কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত করেনি। কিন্তু ঘটনার ১৫ বছর পর, ২০০৪ সালে আর্জেন্টিনার এক টেলিভিশন টকশোতে এসে ডিয়েগো ম্যারাডোনা নিজেই আগুনে ঘি ঢালেন।
হাসতে হাসতে ম্যারাডোনা ইঙ্গিত দেন, ব্রাঙ্কোকে সেদিন তারা "পবিত্র জল" (Holy Water) খাইয়েছিলেন, যাতে মূলত ঘুমের ওষুধ (Tranquilizer) মেশানো ছিল। স্টুডিওতে হাসির রোল উঠলেও ব্রাজিলে তা ক্ষোভের ঝড় তোলে। যদিও সে দলের কোচ কার্লোস বিলার্দো সরাসরি স্বীকারোক্তি দেননি, তবে তাঁর রহস্যময় মন্তব্য বিতর্ককে আরও উসকে দেয়। তিনি বলেছিলেন—
"আমি বলছি না যে এমন কিছু ঘটেনি।"
পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার তৎকালীন অনেক খেলোয়াড় অবশ্য দাবি করেন, এটি ম্যারাডোনার চিরচেনা স্বভাবসুলভ এক রসিকতা মাত্র ছিল, বাস্তবে এমন কিছু করার সাহস বা সুযোগ কারও ছিল না।
আসলেই কি সেদিন ফুটবলের চেতনাকে কালিমালিপ্ত করে কোনো ড্রাগ মেশানো পানি খাওয়ানো হয়েছিল? নাকি এটি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েল করার এক মনস্তাত্ত্বিক রসিকতা, যা পরে ব্রাজিলের হারের ক্ষত ঢাকার অস্ত্র হয়ে ওঠে?
কোনো রায় আসেনি, কোনো শাস্তিও হয়নি।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ট্রফি অনেক আছে, নায়কও কম নেই। কিন্তু একটা পানির বোতল কীভাবে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, সেই অমিমাংসিত রহস্য ফুটবল বিশ্বকে আজও তাড়া করে বেড়ায়। ডিয়েগো ম্যারাডোনা সত্যটা জানতেন, কিন্তু ২০২০ সালে সেই সত্যকে নিজের বুকেই চেপে ধরে ওপাড়ে পাড়ি জমিয়েছেন ফুটবলের এই রাজপুত্র।
[বিদেশী পত্র পত্রিকা অবলম্বনে]
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬