খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের ঢল: রাষ্ট্রীয় শোক ও গণমানুষের শ্রদ্ধায় সিক্ত রাজধানী

Date:

spot_img

এম হোসাইন আহমদ, বিশেষ প্রতিবেদক :

বিএনপির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজাকে ঘিরে রাজধানী ঢাকায় দেখা গেছে অভূতপূর্ব জনসমাগম। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা—এই দুই প্রান্তকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ঢল নামে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জনস্রোত এমন আকার ধারণ করে যে সংসদ ভবনের চত্বর ছাড়িয়ে বিজয় সরণি, মিরপুর সড়ক, ফার্মগেট হয়ে কাওরান বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এক বিশাল মানবসমুদ্র।
খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজায় অংশ নেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবর্গ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, সরকারি ও বেসরকারি খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা দলীয় নেতাকর্মী ও সর্বস্তরের জনগণের উপস্থিতিতে জানাজাস্থল পরিণত হয় রাষ্ট্রীয় শোক ও গণমানুষের আবেগের এক অনন্য মিলনমেলায়। আন্তর্জাতিক পরিসরেও এ শোকের প্রতিধ্বনি শোনা যায়—ভারত, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের প্রতিনিধিরাও জানাজায় অংশ নেন।
সকাল থেকেই জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা বলয় ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যেও জনসমাগম ক্রমেই ঘনীভূত হয়। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের অনেককেই জানাজায় অংশ নিতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়—যা শোকের মুহূর্তে শৃঙ্খলা ও সম্মিলিত শ্রদ্ধাবোধের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। মানুষের ভিড়ের কারণে খালেদা জিয়ার মরদেহ বহনকারী গাড়িবহর জানাজাস্থলে পৌঁছাতে সময় নেয়; ফলে উপস্থিত জনতাকে অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘক্ষণ। তবু অপেক্ষার সেই সময়টুকুতে কোথাও বিশৃঙ্খলা নয়—ছিল নীরবতা, প্রার্থনা আর শ্রদ্ধার আবহ।
নামাজে জানাজা শেষে খালেদা জিয়ার মরদেহ জিয়া উদ্যানে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর স্বামী, স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। এ পর্বে শোকাবহ পরিবেশ আরও গভীর হয়—দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত শেষ বিদায়ে চোখের জল সংবরণ করতে পারেননি।
জানাজা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন নেয় কঠোর ও সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউমুখী মিরপুর সড়কসহ আশপাশের এলাকায় সব ধরনের যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের আড়ং সংলগ্ন প্রবেশপথ সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ থাকলেও বিকল্প হিসেবে একাধিক পথ খুলে দেওয়া হয়। খামারবাড়ি ও বিজয় সরণি এলাকার সড়কগুলো উন্মুক্ত রাখা হয়, যেসব পথে হাজারো মানুষ পায়ে হেঁটে জানাজায় অংশ নেন। সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নেতাকর্মীরা দলীয় পতাকা ও জাতীয় পতাকা হাতে শোকের মিছিলে শামিল হন; কারও হাতে ছিল কালো পতাকা—যা শোকের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
এই জানাজা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রীর বিদায় নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় শোক ও গণমানুষের সম্মিলিত শ্রদ্ধা। মতাদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে—খালেদা জিয়া ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর প্রভাব রাজনৈতিক সীমানা ছাড়িয়ে সমাজের বিস্তৃত পরিসরে প্রতিফলিত। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে লাখো মানুষের এই শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে—শোকের ভারে নত, কিন্তু শৃঙ্খলা ও মর্যাদায় উজ্জ্বল এক দিন হিসেবে।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...