রংপুর প্রতিবেদক
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিশ্বর কুমার সিংহ রায়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ বাণিজ্য এবং সরকারি খাদ্য কার্যক্রমে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ এনে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, রংপুরের নিকট একটি লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষকদল বদরগঞ্জ উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. শফিকুল ইসলাম।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্য অফিসকে কেন্দ্র করে একটি দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিশ্বর কুমার সিংহ রায়ের প্রত্যক্ষ মদদে সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রম, ডিলার নিয়োগ, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ফুড লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এতে সরকার যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি প্রকৃত কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণও তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বদরগঞ্জে বদলি হয়ে আসা বিশ্বর কুমার সিংহ রায় নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও রহস্যজনক কারণে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগকারীর দাবি।

ধান-চাল সংগ্রহে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, চলতি আমন ও বোরো মৌসুমে বদরগঞ্জ উপজেলায় ২৬টি চালকল সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলেও বাস্তবে মাত্র ৮টি চালকল থেকে চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। বাকি ১৮টি চালকলের ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে চাল সরবরাহ দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেন, প্রকৃতপক্ষে অনেক চালকল সরকারি গুদামে কোনো চাল সরবরাহ না করলেও কাগজপত্রে সরবরাহ দেখানো হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি গুদামে নিম্নমানের চাল সরবরাহের ক্ষেত্রেও খাদ্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি মানদণ্ড উপেক্ষা করে নির্দিষ্ট কিছু মিল মালিককে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন করা হয়েছে।
প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করে দালালদের মাধ্যমে ধান ক্রয়ের অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের বোরো মৌসুমে সরকারি ধান সংগ্রহ কর্মসূচিতে প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের পরিবর্তে দালালদের মাধ্যমে ভুয়া কৃষক তালিকা তৈরি করা হয়। পরে ওই তালিকার মাধ্যমে ধান সংগ্রহ দেখিয়ে সরকারি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। এর ফলে প্রকৃত কৃষকরা সরকারের ঘোষিত সহায়ক মূল্যে ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে এই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিলার নিয়োগে লাখ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় হতদরিদ্র মানুষের মাঝে চাল বিতরণের জন্য ডিলার নিয়োগেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু নিয়োগের সময়ই নয়, বরাদ্দ প্রদান, চাল উত্তোলন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রেও ডিলারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
ফুড লাইসেন্স পেতে ঘুষ না দিলে হয়রানির অভিযোগ
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, উপজেলার বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানকে ফুড লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। কোনো ব্যবসায়ী ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার আবেদন দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা, অযৌক্তিক আপত্তি দেওয়া এবং নানা ধরনের প্রশাসনিক হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
খাদ্যবান্ধব কার্ড বিতরণেও অনিয়মের অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় নতুন কার্ড প্রদান ও উপকারভোগী নির্বাচনেও অনিয়ম হয়েছে। প্রকৃত সুবিধাভোগীদের পরিবর্তে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। এতে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলো সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং সুবিধাভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
অফিসে অনুপস্থিতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ
অভিযোগে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিত থাকা, দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা এবং সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেন, অনেক সময় সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা নিতে গিয়ে তাকে অফিসে পান না। ফলে জনগণকে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এছাড়া সরকারি অফিসে ধূমপানবিরোধী আইন অমান্য করে অফিস কক্ষে ধূমপান করার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
অভিযোগকারী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারি খাদ্য কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। অন্যথায় সাধারণ মানুষ ও প্রকৃত কৃষকরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।”
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা
এদিকে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার পর বিষয়টি বদরগঞ্জজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি শুধু একজন কর্মকর্তার অনিয়ম নয়, বরং সরকারি খাদ্য ব্যবস্থাপনার জন্যও একটি বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, খাদ্য অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের প্রতি দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিপ্লব কুমার সিংহ রায় কে ফোন দিলে দিলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। তাই তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬