
রংপুর ব্যুরো
রংপুর আদালত চত্বরে আইনজীবী সহকারী সমিতি (মোহরার) নির্বাচনের প্রচারণা ও সংগঠনের জমানো টাকার হিসাব চাওয়াকে কেন্দ্র করে আইনজীবী ও মুহুরীদের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় আদালতপাড়ায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুইজনকে আটক করে রংপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের হাজত খানায় আটক রাখে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন আইনজীবী সহকারী সমিতি (মোহরার) নির্বাচনের প্রচারণার অংশ হিসেবে আদালত চত্বরে মাইকিং চলছিল। এ সময় সংগঠনের জমানো অর্থের হিসাব-নিকাশ নিয়ে আলোচনা ও প্রশ্ন উত্থাপনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এ সময় রংপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদ এবং তার সঙ্গে থাকা কয়েকজনের ওপর মুহুরি আতিয়ার রহমান ও তার অনুসারীরা চড়াও হন। উভয় পক্ষের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা এবং পরে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে আদালতপাড়ায় উপস্থিত আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার একপর্যায়ে আইনজীবীদের সঙ্গে আতিয়ার রহমানের তর্ক-বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করে। এমন পরিস্থিতিতে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন আতিয়ার রহমানের ছেলে জাবেদ রহমান, যিনি পেশায় একজন মুহুরি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের হুমকিমূলক বক্তব্য দিতে থাকেন এবং মারধরের হুমকি দেন। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রংপুর আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাহেদ কামাল ইবনে খতীব ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করেন। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, জাবেদ রহমান তখনও উত্তেজিত আচরণ করতে থাকেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করার প্রচেষ্টা ব্যাহত হয়। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে আবারও ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে আদালত চত্বরে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা দ্রুত হস্তক্ষেপ করেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে আতিয়ার রহমান ও তার ছেলে জাবেদ রহমানকে আটক করে আদালতের হাজত খানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার পর আদালতপাড়াজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আইনজীবী মহলের অনেকেই এ ঘটনাকে আদালতের পরিবেশ ও পেশাগত সৌহার্দ্যের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে রংপুর আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট সবুক্তগীন আহমেদ নিরব বলেন,"আদালত চত্বর কোনো সংঘাত বা শক্তি প্রদর্শনের স্থান নয়। এখানে যারা বিচার ও আইনের সেবা নিতে আসেন, তাদের সামনে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা চাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।"
রংপুর আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট রোকনুজ্জামান রোকন বলেন, "আদালতের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। যারা আইনজীবীদের হুমকি দিয়েছে এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।"
আইনজীবী সমিতির সদস্য পলাশ কান্তি নাগ বলেন, "আইনজীবী ও মুহুরীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পেশাগত সম্পর্ক রয়েছে। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে সেই সম্পর্কের অবনতি হোক আমরা তা চাই না। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।"
আইনজীবী সমিতির সদস্য ফয়সাল আহমেদ বলেন,"ঘটনার সময় আদালত চত্বরে অনেক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এ ধরনের বিশৃঙ্খলা আদালতের পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।"
আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট মো. কাওসার আলী বলেন, "আমরা সবসময় আইনের শাসন ও শৃঙ্খলার পক্ষে। আদালতের পরিবেশ নষ্ট হয় এমন কোনো আচরণ কারও কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।"
মুহুরী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য
রংপুর আইনজীবী সহকারী সমিতি (মোহরার) এর সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান বলেন, "আমরা আইনজীবীদের সঙ্গে কোনো বিরোধ চাই না। আইনজীবীরা আমাদের অভিভাবকস্বরূপ। তারা ছাড়া আমাদের পেশাগত কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। আজকে বাবা-ছেলে যে আচরণ করেছে, সেটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। আমরা আদালতপাড়ায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে চাই।"
সভাপতির বক্তব্য
রংপুর আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাহেদ কামাল ইবনে খতীব বলেন, "ঘটনার খবর পেয়ে আমি দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই এবং উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানাই। আদালতের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। কোনো অবস্থাতেই আদালত চত্বরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে দেওয়া যায় না। বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী সমিতি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।"
পুলিশের বক্তব্য
রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের বলেন,আদালত চত্বরে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতির খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে দুইজনকে আটক করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়গুলো এখনো জানিনা,থানায় আসলে এ বিষয়ে বলতে পারবো। দোষীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আদালতপাড়ায় উদ্বেগ
ঘটনার পর আদালতপাড়ায় আইনজীবী, মুহুরি ও বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। আদালত সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, পেশাগত সম্পর্কের মধ্যে কোনো ধরনের বিরোধ সৃষ্টি হলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। আদালতকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বা উত্তেজনা শুধু সংশ্লিষ্টদেরই নয়, বিচারপ্রার্থীদের মাঝেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে আদালতের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬