রংপুর ব্যুরো
কোরবানির ঈদ এলেই এতিমখানা, মাদরাসা ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটার কথা। কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে বছরের একটি বড় সময়ের ব্যয় নির্বাহ করে দেশের হাজারো ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু রংপুরে এবারও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সরকারি মূল্য নির্ধারণ থাকা সত্ত্বেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকায়। কোথাও কোথাও খাসির চামড়া ক্রেতা না পেয়ে বিনামূল্যেই দিতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এতিমখানা, হাফিজিয়া মাদরাসা, লিল্লাহ বোর্ডিং, দরিদ্র পরিবার এবং ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের বাজার অস্থিরতা, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, ট্যানারি মালিকদের বকেয়া, পুঁজি সংকট এবং কার্যকর সরকারি নজরদারির অভাবে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
জেলার ৮ উপজেলায় চামড়ার বাজারে ধস
রংপুর সদর, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ, পীরগাছা, কাউনিয়া ও গঙ্গাচড়া উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ এলাকায় গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে নামমাত্র মূল্যে। বিশেষ করে বদরগঞ্জের ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং তারাগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে অনেক চামড়া ১০০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার সরকারি মূল্য যেখানে এক হাজার টাকার বেশি হওয়ার কথা, সেখানে ১০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন কোরবানিদাতারা। এতে করে চামড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থের ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র মানুষ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরকারের ঘোষণা আর বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ফারাক
গত ১৩ মে সরকার ঢাকার বাইরে গরুর লবণযুক্ত চামড়ার মূল্য প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করে। সেই হিসাবে একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার মূল্য এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই মূল্য পাওয়া তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে তার এক-চতুর্থাংশ মূল্যও পাননি বিক্রেতারা। চামড়া সংগ্রহকারী মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষ বলছেন, সরকারি ঘোষণা শুধুমাত্র সংবাদ সম্মেলন ও কাগজে সীমাবদ্ধ থেকেছে মাঠপর্যায়ে তার কোনো বাস্তবায়ন হয়নি।
লোকসানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা
বদরগঞ্জ উপজেলার মাংস ব্যবসায়ী হবিবার রহমান বদরগঞ্জের উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে ঘুরে ২০০টি গরু ও ৩০টি খাসির চামড়া সংগ্রহ করেন। কিন্তু বাজারে গিয়ে তিনি দেখেন, চামড়ার কোনো চাহিদা নেই। তিনি বলেন, খাসির চামড়া অনেক জায়গায় ফ্রি দিয়েছি। যে টাকা দিয়ে গরুর চামড়া কিনেছি ১০০ কোথাও ২০০ তারপরও গরুর চামড়ায় লোকসান হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর আর চামড়ার ব্যবসা করবো না।হবিবার রহমানের মতো শত শত মৌসুমি ব্যবসায়ী এবার লোকসানের মুখে পড়েছেন বলে জানা গেছে।
মাদরাসা ও এতিমখানা গুলোতে বড় ধাক্কা
প্রতি বছর কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ মাদরাসা ও এতিমখানার অন্যতম বড় আয়ের উৎস। কিন্তু এবারও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়েছে।
বদরগঞ্জ রোডের একটি হাফিজিয়া মাদরাসার এক শিক্ষক জানান, মানুষ বিপুল পরিমাণ চামড়া দান করলেও সেগুলো বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়া যায়নি। অনেক চামড়া বিক্রি না করে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পরে বিক্রি করতে গিয়ে দেখি দাম এ করতেতেছে না। তিনি বলেন, “চামড়ার যে দাম বলা হচ্ছে, বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই।”
ঐতিহ্য হারাচ্ছে রংপুরের চামড়াপট্টি
এক সময় রংপুরের হাজীপাড়া চামড়াপট্টি ছিল উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ চামড়া বাণিজ্যকেন্দ্র। শতাধিক ব্যবসায়ী সেখানে চামড়া কেনাবেচা করতেন। ঈদ মৌসুমে হাজার হাজার চামড়া জমা হতো ওই এলাকায়। কিন্তু এখন সেই চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, এক সময়ের চামড়ার গুদামগুলো এখন অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও যন্ত্রাংশের দোকানে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়রা এখন এলাকাটিকে ‘চামড়াপট্টি’ নয়, ‘অটোপট্টি’ নামেই বেশি চেনেন। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, টানা লোকসান, ট্যানারি মালিকদের বকেয়া এবং ব্যাংক ঋণের অভাবে অনেকেই বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
সিন্ডিকেট নাকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা?
সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী বাজার নিয়ন্ত্রণ করে চামড়ার দাম কমিয়ে রেখেছেন। তাদের কারণে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হচ্ছে না। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূল সমস্যা সিন্ডিকেট নয় বরং পুঁজি সংকট, ট্যানারি মালিকদের বকেয়া এবং ঋণ সুবিধার অভাব। স্থানীয় এক প্রবীণ ব্যবসায়ী বলেন, “প্রকাশ্যে সিন্ডিকেট না থাকলেও কয়েকজনের মধ্যে অলিখিত সমঝোতা রয়েছে। ফলে দাম বাড়ার সুযোগ তৈরি হয় না।”
চামড়া শিল্প বাঁচাতে জরুরি পদক্ষেপের দাবি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি সম্ভাবনাময় খাত হওয়া সত্ত্বেও চামড়া শিল্প দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি চামড়া ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান। কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে আধুনিক হিমাগার নির্মাণ। ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পরিশোধে কঠোর নজরদারি।চামড়া বাজারে সিন্ডিকেট ও কারসাজি বন্ধে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন। চামড়া শিল্পের জন্য পৃথক বোর্ড বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠা। চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতকরণ।
দুই লাখের বেশি পশু কোরবানি, তবুও নেই ন্যায্যমূল্য
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর রংপুর জেলায় প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার পশু কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে গরু ও মহিষের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার। চামড়া সংরক্ষণের জন্য জেলার ছয় শতাধিক মাদরাসা ও এতিমখানায় ১৯৫ মেট্রিক টন লবণ বিতরণ করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, কোথাও চামড়া অবিক্রিত অবস্থায় নষ্ট হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে প্রশ্ন থেকে গেছে চামড়া সংরক্ষণ করা গেলেও যদি ন্যায্যমূল্য না মেলে, তাহলে এতিম, মাদরাসা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন কীভাবে?
চূড়ান্ত বাস্তবতা
এক সময় যে চামড়া ছিল কোরবানির অন্যতম মূল্যবান উপকরণ, আজ সেটিই অনেকের কাছে বোঝায় পরিণত হয়েছে। রংপুরে কোরবানির চামড়ার বাজারের বর্তমান চিত্র শুধু একটি জেলার সংকট নয়; এটি দেশের চামড়া শিল্পের গভীর অসুস্থতার প্রতিচ্ছবি। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে দেশের ঐতিহ্যবাহী চামড়া শিল্পের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে হাজারো এতিমখানা, মাদরাসা ও দরিদ্র মানুষের অধিকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬