নিজস্ব প্রতিবেদক
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই একের পর এক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারি অর্থের অপচয় কমানো, প্রশাসনের অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল ভাঙা, বিদেশ সফরের নামে সরকারি সুবিধাভোগের সংস্কৃতিতে লাগাম টানা এবং জনপ্রতিনিধিদের জন্য বিশেষ সুবিধা সংকুচিত করার বিষয়ে তিনি শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। গত সাড়ে তিন মাসে নেওয়া একাধিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঘোষিত অবস্থান থেকে সরে না এসে বরং ধারাবাহিকভাবেই সেই নীতিকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন তিনি।
সর্বশেষ উদাহরণ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি বিদেশ সফর বাতিলের সিদ্ধান্ত।
মশকনিধন কার্যক্রম পরিদর্শনের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনসহ পাঁচ কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ও ফ্লোরিডা সফরের প্রস্তাব স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। সফরে একটি কারখানা ও একটি ল্যাব পরিদর্শনের পরিকল্পনা ছিল।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং সূত্রে ১ জুন সোমবার জানা যায়, ওই প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তা নাকচ করে দেন। এ সময় তিনি মন্তব্য করেন, ‘মশকনিধন শেখা বা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার দরকার নেই। দেশেই সন্ধ্যার পর যেকোনো ডোবার পাশে দু-তিন ঘণ্টা অবস্থান করলেই মশকনিধনের অনেক উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব হবে।’
সিদ্ধান্তটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রশাসনিক মহল পর্যন্ত ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই এটিকে সরকারি খরচে বিদেশ ভ্রমণের দীর্ঘদিনের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখছেন।
তবে এটিই প্রথম নয়।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তারেক রহমান ঘোষণা দেন, তিনি সরকারি গাড়ি, সরকারি চালক কিংবা সরকারি জ্বালানি ব্যবহার করবেন না। ব্যক্তিগত কাজে নয়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তিনি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলাচল করবেন বলে জানানো হয়। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর ১৩-১৪টি থেকে কমিয়ে চারটিতে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সেদিনই আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও বিদেশি অতিথি গ্রহণ ছাড়া সাধারণ চলাচলে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত হয়। তার চলাচলের সময় সড়কের দুই পাশে পোশাকধারী পুলিশের সারিবদ্ধ অবস্থান বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। জনদুর্ভোগ কমাতে মন্ত্রিসভার বৈঠকও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিবর্তে সচিবালয়ে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর একদিন পর ১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে প্রশাসনিক ব্যয় সাশ্রয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। ওই বৈঠকে মন্ত্রীদের অপ্রয়োজনীয় ও বাহুল্য খরচ পরিহারের আহ্বান জানানো হয়। একই বৈঠকে সংসদ সদস্যদের জন্য দীর্ঘদিনের বিভিন্ন বিশেষ সুবিধা পুনর্বিবেচনার বিষয়ও আলোচনায় আসে।
সরকার গঠনের পর প্রথম কর্মসূচিগুলোর একটি ছিল শনিবার অফিস চালু রাখা। ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শনিবার নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সপ্তাহে কার্যদিবস বৃদ্ধির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশাসনিক গতি বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরপর ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিলসংক্রান্ত আইন সংশোধনের খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। পরদিন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও একাধিক গণমাধ্যম বিষয়টি নিশ্চিত করে। দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত এই সুবিধা প্রত্যাহারের উদ্যোগকে রাজনৈতিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন অনেক বিশ্লেষক।
সরকারি সূত্র বলছে, এসব সিদ্ধান্ত বিচ্ছিন্ন নয়। বরং একই দর্শনের অংশ। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারে সংযম, সরকারি ব্যয়ে জবাবদিহি এবং বিশেষ সুবিধাভোগী সংস্কৃতি কমিয়ে আনার নীতি অনুসরণ করেই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের অনেকে মনে করেন, বিগত বছরগুলোতে প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা বিনিময়, সক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা গবেষণার নামে বিদেশ সফরের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছিল। অনেক ক্ষেত্রেই এসব সফরের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে ফ্লোরিডা সফর বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রশাসনের জন্য একটি নতুন বার্তা বহন করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় আসার পর অনেক নেতা ও সরকার ঘোষিত অবস্থান থেকে দ্রুত সরে যান। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর গত সাড়ে তিন মাসে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি অপচয় কমানো এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধার সংস্কারে যে অবস্থান নিয়েছিলেন, সেখান থেকে আপাতত সরে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন আলোচনার বিষয় শুধু একটি বিদেশ সফর বাতিল নয়। বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় মিতব্যয়িতা ও জবাবদিহিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন প্রশাসনিক সংস্কৃতি কতদূর পর্যন্ত এগিয়ে নিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সেটিই।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬