আলী কদর পলাশ
টেবিলের ওপর রাখা আমার কলিজার টুকরো, আমার নিষ্পাপ মা-মণির ছবিটার দিকে আজ আমি তাকাতে পারছি না। ছবিটার দিকে তাকালেই বুকের ভেতরটা এমনভাবে মুচড়ে উঠছে, যেন এই বুঝি দমটা আটকে যাবে। চোখের নোনা জলে সামনের পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে আসে।
আজ আমি কোনো লেখক নই। কোনো সম্পাদক নই। আজ আমি শুধু এক অসহায় বাবা। বুকভাঙা আতঙ্কে কাঁপতে থাকা এক পিতা, যে নিজের সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়েও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা খুঁজে পায় না।
যখনই খবরের কাগজে কিংবা মোবাইলের স্ক্রিনে ছোট্ট রামিসাদের ক্ষতবিক্ষত দেহের খবর দেখি, নিজের অজান্তেই আমার হাত গিয়ে থামে আমার মেয়ের বুকে। মাঝরাতে সে যখন নিশ্চিন্তে আমার হাত ধরে ঘুমিয়ে থাকে, আমি ওর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনি আর আতঙ্কে আমার শরীর শিউরে ওঠে। মনে হয়, এই পৈশাচিক পৃথিবীতে আমি আর কতক্ষণ আগলে রাখতে পারব আমার ছোট্ট দেবীটাকে?
আমরা কোন সমাজে বাস করছি?
যেখানে একটি শিশুর হাসি, তার শৈশব, তার এক আকাশ স্বপ্ন এক নিমেষে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে মানুষরূপী কিছু দানব?
ঢাকার পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসাও সেদিন অন্য দিনের মতো পাশের ফ্ল্যাটে গিয়েছিল। পরিচিত মানুষ। পরিচিত পরিবেশ। পরিবারের আস্থার জায়গা। কিন্তু সেই ঘর থেকেই ফিরে আসে তার খণ্ডিত মরদেহ।
পুলিশ জানিয়েছে, মিরপুর-১১ নম্বরের একটি ফ্ল্যাটে শিশুটিকে প্রথমে টয়লেটে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। পরে গলা কেটে হত্যা করা হয় তাকে। মাথার অংশ পাওয়া যায় টয়লেটে, আর শরীরের বাকি অংশ উদ্ধার করা হয় খাটের নিচ থেকে। হত্যার পর মরদেহ গুম করারও চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, অপরাধ গোপন করতে এবং মরদেহ সরিয়ে ফেলতে অভিযুক্ত ব্যক্তি লাশ খণ্ডবিখণ্ড করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শিশুটির মা বিষয়টি টের পেয়ে যাওয়ায় সে পুরো পরিকল্পনা শেষ করতে পারেনি এবং জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো মানুষ লিখেছেন, এখন শুধু অপরিচিত নয়, আত্মীয়-প্রতিবেশীকেও শিশুদের ক্ষেত্রে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পল্লবীর এই ঘটনায় অভিযুক্ত সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আদালতে নেওয়ার পর তিনি দায় স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছেন বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
কিন্তু রামিসার গল্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধী থাকে শিশুর খুব পরিচিত কেউ।
শিশুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি যখন ‘বিশ্বাসের মানুষ’
২৮ বছর বয়সী সুরভী আজও ভুলতে পারেন না শৈশবের সেই দুপুর।
গ্রামের বাড়ি। উঠোনঘেরা কয়েকটি ঘর। চারপাশে আত্মীয়স্বজন। ক্লাস টু-তে পড়া ছোট্ট মেয়েটিকে এক কাজিন ঘরে ডাকল। সে গেলও স্বাভাবিকভাবেই। কারণ মানুষটা পরিচিত ছিল।
তারপর হঠাৎ মুখ চেপে ধরা। আতঙ্ক। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা। চিৎকার করতে না পারা।
বহু বছর পর বড় হয়ে তিনি বুঝেছেন, সেটি ছিল যৌন নির্যাতন।
বিবিসিকে তিনি বলেন, “আমি তখন কাউকে বলতে পারিনি। ভয় দেখানো হয়েছিল। বড় হওয়ার পর মনে হতো আমি সমাজে খাপ খাওয়াতে পারি না। নিজের ভেতরে সবসময় একটা অসম্পূর্ণতা কাজ করতো।”
সুরভীর মতো অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে খুব কম মানুষই বলেন। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, এই নীরবতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভয়ংকর বাস্তবতা।
বাংলাদেশে শিশু যৌন নির্যাতনের প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুর পরিচিত কেউ, আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু কিংবা পরিবারের বিশ্বস্ত মানুষ। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং “চাইল্ড সেক্সুয়াল এবিউজ ইন বাংলাদেশ” শীর্ষক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীনের গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ২৫ শতাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি। ৩৩ শতাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত ছিল আত্মীয়। আর ৪২ শতাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত ছিল পরিচিত মানুষ, যেমন প্রতিবেশী বা নিয়মিত বাড়িতে আসা-যাওয়া করা কেউ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা রেইন (RAINN)-এর তথ্যও উদ্বেগ বাড়ায়। তারা বলছে, শিশুদের প্রতি সংঘটিত প্রতি ১০০টি যৌন সহিংসতার ৯৩টিতেই অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুর পরিচিত কেউ। এর মধ্যে পরিবারের সদস্য ৩৪ শতাংশ এবং অন্যান্য পরিচিত ব্যক্তি ৫৯ শতাংশ।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি আটজন নারী বা কিশোরীর একজন ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
কেন শিশুরাই সহজ শিকার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তারা ভয় পায়, বিভ্রান্ত হয় এবং অনেক সময় ঘটনাটি ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না।
অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীনের ভাষায়, “বাচ্চারা কিছু বলতে পারে না বলেই তারা টার্গেট।”
অধিকারকর্মীদের মতে, অপরাধীরা সাধারণত পারিবারিক বিশ্বাসকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। কারণ পরিবার ভাবে, “চেনা মানুষ তো, সমস্যা হবে না।”
এই বিশ্বাসই অনেক সময় শিশুদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
শিশুর আচরণ বদল কি সংকেত?
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বলছেন, যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার পর শিশুদের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
স্কুলে যেতে না চাওয়া, খিটখিটে আচরণ, হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়া, রাতে দুঃস্বপ্ন দেখা, একা থাকতে চাওয়া, মানুষের সঙ্গে মিশতে ভয় পাওয়া কিংবা হঠাৎ পুরুষদের এড়িয়ে চলা, এসবই হতে পারে ভেতরের গভীর আতঙ্কের লক্ষণ।
তিনি বলেন, “শিশুর মধ্যে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, হীনমন্যতা তৈরি হতে পারে। অনেক সময় সে মানুষকে ভয় পেতে শুরু করে।”
শুধু মানসিক নয়, শারীরিক লক্ষণও দেখা দিতে পারে। ঘুমের সমস্যা, মাথাব্যথা, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, এমনকি সামান্য চাপেই জ্ঞান হারানোর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলোকে “বাচ্চার জেদ” ভেবে উড়িয়ে দিলে বিপদ আরও বাড়তে পারে।
শিশুদের কী শেখাবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের খুব ছোটবেলা থেকেই “গুড টাচ” ও “ব্যাড টাচ” সম্পর্কে শেখানো জরুরি।
শিশুকে জানতে হবে তার শরীরের ব্যক্তিগত অংশ সম্পর্কে। তাকে শেখাতে হবে, কেউ তার অনুমতি ছাড়া শরীর স্পর্শ করতে পারবে না। কোনো স্পর্শে অস্বস্তি লাগলে সঙ্গে সঙ্গে “না” বলতে হবে এবং নিরাপদ কোনো বড় মানুষকে জানাতে হবে।
ডা. মেখলা সরকার বলেন, “বাবা-মা সবসময় পাশে থাকবে, এমন না। কিন্তু শিশুকে বুঝতে হবে যে বাবা-মায়ের নজর আছে।”
কর্মজীবী বাবা-মায়েদের প্রতি তার পরামর্শ, সম্ভব হলে বাসায় সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা এবং গৃহশিক্ষক বা পরিচিত কারও সঙ্গেও শিশুকে পুরোপুরি একা না রাখা।
আইন আছে, কিন্তু বিচার?
বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০।
এই আইনে ধর্ষণের ফলে নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ধর্ষণের চেষ্টা করলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। দলবদ্ধ ধর্ষণে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাত হলে জড়িত সবাই সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে।
কিন্তু মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, আইনের চেয়ে বড় সংকট এর বাস্তবায়নে।
অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, “আইনে সমস্যা নেই। সমস্যা বাস্তবায়নে। অনেক মামলায় চার্জশিট দিতে দেরি হয়, বিচার ঝুলে থাকে।”
তার মতে, বাংলাদেশে এখন ধর্ষণের পর হত্যা বাড়ছে, কারণ অপরাধীরা ভয় পায় শিশু বেঁচে গেলে সব বলে দেবে।
অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, “বাংলাদেশে মেয়েশিশুর জন্য ঝুঁকি ঘরেও, বাইরেও। পরিবার অনেক সময় ঘটনাগুলো গোপন করতে চায়। থানায় যাওয়ার বিষয়েও নিরুৎসাহিত করা হয়।”
সবচেয়ে জরুরি কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু সুরক্ষার সবচেয়ে বড় জায়গা হলো বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করা।
শিশু যেন ভয় না পায়। যেন মনে না করে সত্য বললে তাকে দোষ দেওয়া হবে।
কারণ অনেক সময় শিশুর কান্না, হঠাৎ বদলে যাওয়া আচরণ কিংবা নির্দিষ্ট কারও কাছে যেতে ভয় পাওয়া, এগুলোই হতে পারে বড় কোনো বিপদের প্রথম সংকেত।
রামিসা আর ফিরে আসবে না।
ফিরে আসবে না তার ছোট্ট পায়ের শব্দ।
তার মায়ের কোল জুড়ে আর কখনও ঘুমিয়ে পড়বে না সে।
কিন্তু রাত গভীর হলে, কোনো এক বাবা হয়তো এখনও নিজের ঘুমন্ত মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আতঙ্কে কেঁপে ওঠেন।
কোনো এক মা হয়তো বুকের ভেতর অজানা শঙ্কা নিয়ে সন্তানের কপালে চুমু খান।
আর কোথাও, খুব নিঃশব্দে, খুব গোপনে, এই সমাজের অন্ধকারে হয়তো আরেকটি শিশুর শৈশব ভেঙে যাচ্ছে।
সেই কান্নার শব্দ আমরা শুনতে পাই না।
শুধু বাতাসটা মাঝে মাঝে খুব ভারী হয়ে ওঠে।
লেখক : প্রধান সম্পাদক
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬