পৃথিবীর দুই প্রান্তে একই লড়াই

Date:

spot_img

শিউলি সাহা

প্রশান্ত মহাসাগরের গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে একটি ছোট্ট পেঙ্গুইন খাবারের খোঁজে ঠান্ডা পানিতে ডুব দেয়। সেই পানিই তার জীবন, তার খাদ্য, তার বেঁচে থাকার ভরসা। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে সুন্দরবনের নদীখালে ভেসে ওঠে একটি শুশুক। মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নিয়ে আবার হারিয়ে যায় পানির নিচে। তার জীবনও বাঁধা নদীর স্রোত, মাছ আর সুস্থ জলজ পরিবেশের সঙ্গে।

দুই প্রাণী কখনো একে অন্যকে দেখবে না। একজন থাকে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপে, অন্যজন বাংলাদেশের নদীতে। ভৌগোলিক দূরত্ব বিশাল, জীবনযাপনও ভিন্ন। তবু তাদের টিকে থাকার সংকট যেন একই সুতোয় বাঁধা।

বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এ বছর শক্তিশালী “সুপার এল নিনো” তৈরি হলে গ্যালাপাগোস পেঙ্গুইনের বড় অংশ মারা যেতে পারে। পৃথিবীতে বর্তমানে মাত্র প্রায় দুই হাজার গ্যালাপাগোস পেঙ্গুইন টিকে আছে। উষ্ণ সমুদ্রের কারণে ঠান্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানির প্রবাহ কমে গেলে খাদ্য মাছ অন্যত্র সরে যায়। ফলে ভেঙে পড়ে পুরো খাদ্যচক্র।

১৯৮২-৮৩ সালের শক্তিশালী এল নিনোতে গ্যালাপাগোসের ৭৭ শতাংশ পেঙ্গুইন মারা গিয়েছিল। একই সময় ধ্বংস হয়েছিল অগভীর পানির ৯৭ শতাংশ প্রবাল। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এবারও পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।

এই সংকট শুধু গ্যালাপাগোসের নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের নদী, উপকূল ও জলাভূমিকেও বদলে দিচ্ছে। সুন্দরবনের ইরাবতী ডলফিন, গাঙ্গেয় শুশুক কিংবা বিরল জলচর পাখি মাস্কড ফিনফুটও টিকে থাকার লড়াই করছে পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলজ প্রাণীদের জীবন সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে পানির তাপমাত্রা, খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যের ওপর। সমুদ্র বা নদীর পরিবেশে সামান্য পরিবর্তনও তাদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টি, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি নদীনির্ভর প্রাণীদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি চাপে।

গ্যালাপাগোসের পেঙ্গুইন হয়তো জানে না বাংলাদেশ কোথায়। সুন্দরবনের শুশুকও জানে না এল নিনো কী। কিন্তু মানুষের তৈরি উষ্ণ পৃথিবী তাদের দুজনকেই একই লড়াইয়ের অংশ করে তুলেছে। যখন সমুদ্র উষ্ণ হয়, নদী বদলে যায়, মাছ সরে যায়, তখন সবচেয়ে আগে বিপদে পড়ে সেই প্রাণীরা, যাদের বাঁচার জায়গা খুব সীমিত।

প্রকৃতির এই সংকেত বিজ্ঞানীদের কাছে শুধু পরিবেশগত সতর্কবার্তা নয়, বরং মানুষের জন্যও একটি বড় প্রশ্ন। গ্যালাপাগোসের পেঙ্গুইন, সুন্দরবনের শুশুক বা নদী-জলাভূমির নীরব প্রাণীরা আসলে পৃথিবীর স্বাস্থ্যের প্রথম সংবাদদাতা। তারা বিপদে পড়লে বুঝতে হবে, পরিবেশের ভেতরে কোথাও গভীর অসুস্থতা শুরু হয়েছে।

কারণ কোনো প্রাণীর হারিয়ে যাওয়া শুধু একটি প্রজাতির মৃত্যু নয়, সেটি একটি বাস্তুতন্ত্রের ভেঙে পড়ার লক্ষণ। আর সেই ভাঙন একদিন মানুষের জীবনকেও ছুঁয়ে যায়।

পৃথিবীর সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রাণীরা যদি টিকে থাকতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে মানুষ কতটা নিরাপদ থাকবে?

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...