আলী কদর পলাশ
সংবাদপত্র শুধু সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম নয়; এটি একটি সময়ের ভাষা, সমাজের বিবেক এবং জাতির আত্মপ্রকাশের অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেত্র। একটি পত্রিকার নাম যেমন তার পরিচয় বহন করে, তেমনি তার স্লোগান বহন করে তার দর্শন, দায়িত্ববোধ এবং সম্পাদকীয় অবস্থান। সেই অর্থে স্লোগান কোনো অলংকার নয়; এটি একটি প্রতিষ্ঠানের আত্মপরিচয়ের সংক্ষিপ্ত ঘোষণা।
“দৈনিক মুখপাত্র”-এর স্লোগান “The Spokesman of Bangladesh” নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নানা আলোচনা, প্রশ্ন ও সমালোচনা দেখা গেছে। কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, একটি বাংলা সংবাদপত্র ইংরেজি স্লোগান ব্যবহার করবে কেন। কেউ বলেছেন, “Spokesman” শব্দটি অত্যন্ত দৃঢ়, অত্যন্ত সরাসরি। আবার অনেকে এটিকে সাহসী ও ব্যতিক্রমধর্মী editorial identity হিসেবেও দেখেছেন। আমরা এই আলোচনাকে ইতিবাচকভাবেই দেখি। কারণ যে শব্দ চিন্তার জন্ম দেয় না, যে বক্তব্য প্রশ্ন তোলে না, যে অবস্থান আলোচনার সৃষ্টি করে না, ইতিহাসে তার স্থায়িত্বও খুব কম।
আজকের পৃথিবীতে branding একটি বড় বাস্তবতা। গণমাধ্যমও এর বাইরে নয়। কিন্তু branding-এর মধ্যেও দুই ধরনের ধারা কাজ করে। একটি ধারা চায় নিরাপদ শব্দ, সমষ্টিগত অনুভূতি, ঝুঁকিহীন ভাষা এবং universally acceptable tone।
The New York Times-এর “All the News That's Fit to Print” কিংবা তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্ব সাংবাদিকতায় জায়গা করে নেওয়া The Guardian, The Observer, The Spectator, Tribune অথবা Herald-এর মতো নামগুলো দেখলেই বোঝা যায়, গণমাধ্যম শুধু সংবাদ পরিবেশন করে না; তারা নিজেদের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানও নির্মাণ করে।
এ কারণেই আজ বিশ্বজুড়ে অসংখ্য slogan শোনা যায়। যেমন “Voice of the People”, “Where the Nation Speaks”, “Truth First”, “People’s Voice”, “News for All”। এগুলো গ্রহণযোগ্য, আধুনিক এবং safe। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো নিজস্ব ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলে।
অন্যদিকে আরেক ধরনের editorial tradition আছে, যেখানে একটি প্রতিষ্ঠান নিজেকে শুধু platform হিসেবে না দেখে একটি editorial entity হিসেবে উপস্থাপন করে। এই ধারার গণমাধ্যমগুলো শুধু সংবাদ বহন করে না; তারা একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানও প্রতিনিধিত্ব করে। “মুখপাত্র” শব্দটিও সেই tradition-এর অংশ।
আমাদের slogan কোনো সরল অনুবাদ নয়; এটি একটি অবস্থান। আমরা বিশ্বাস করি, সংবাদপত্র কেবল জনমতের প্রতিধ্বনি হবে না, বরং সময়, সমাজ, সত্য ও মানুষের পক্ষে স্পষ্ট ভাষায় কথা বলবে। “The Spokesman of Bangladesh” বলার মধ্যে একটি assertive editorial character রয়েছে। এটি শুধু একটি জায়গা বা প্ল্যাটফর্মের কথা বলে না, বরং একটি প্রতিনিধিত্বশীল সত্তার ধারণা দেয়।
এখানে “Spokesman” শব্দটি ব্যক্তি অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, বরং প্রতিনিধিত্ব, articulation এবং দায়িত্ববোধের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সমাজ অনুভব করে। মানুষ কথা বলে। কিন্তু সেই অনুভূতি ও কণ্ঠকে ভাষা দেয় কেউ না কেউ। সংবাদপত্র সেই articulation-এর অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
আমরা বিশ্বাস করি, দৃঢ়তাই প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত। দৃঢ়তা মানে উচ্চকণ্ঠ হওয়া নয়। দৃঢ়তা মানে নিজের অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার থাকা। সময়ের চাপ, জনমত বা সমালোচনার মুখেও নিজের নৈতিক ভিত্তিকে অটুট রাখা। ব্যক্তি হোক বা প্রতিষ্ঠান, যার অবস্থান অস্পষ্ট, তার পরিচয়ও অস্পষ্ট। আর যার পরিচয় অস্পষ্ট, সে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না।
আজকের পৃথিবীতে বহু প্রতিষ্ঠান জনপ্রিয় হওয়ার জন্য নিজেদের ভাষা ও অবস্থানকে ক্রমশ অস্পষ্ট ও ঝুঁকিহীন করে তুলছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, অতিরিক্ত নিরাপদ অবস্থান খুব কম ক্ষেত্রেই স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
The Washington Post ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে “Democracy Dies in Darkness” স্লোগানটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। ১৪০ বছরের ইতিহাসে এটিই ছিল পত্রিকাটির প্রথম official slogan। প্রথমে এটি Snapchat Discover প্ল্যাটফর্মে দেখা যায়, পরে ওয়েবসাইটে এবং এরপর মুদ্রিত সংস্করণে ব্যবহৃত হয়। স্লোগানটি গ্রহণের আগে পত্রিকাটির একটি ছোট সম্পাদকীয় দল পাঁচ শতাধিক সম্ভাব্য slogan নিয়ে আলোচনা করেছিল। শেষ পর্যন্ত “Democracy Dies in Darkness” বেছে নেওয়া হয়, কারণ সেটিই তাদের newsroom philosophy সবচেয়ে শক্তভাবে প্রকাশ করছিল।
এই slogan কোনো আরামদায়ক বাক্য নয়। এটি একটি editorial declaration। এর অর্থ হলো, অন্ধকার, গোপনীয়তা, তথ্য গোপন রাখা এবং সত্যের অনুপস্থিতি গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে। sloganটি প্রথমে ব্যাপক সমালোচনারও জন্ম দিয়েছিল। কেউ একে অত্যন্ত aggressive বলেছিলেন, কেউ অতিরঞ্জিত। কিন্তু সময় প্রমাণ করেছে, স্মরণীয় slogan সাধারণত নিরাপদ শব্দে তৈরি হয় না; তৈরি হয় দৃঢ় অবস্থান থেকে।
The Washington Post-এর মতো একটি প্রাচীন ও প্রভাবশালী পত্রিকা যদি নিজেদের অবস্থানকে এত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে পারে, তাহলে সেটি আমাদের জন্যও একটি শিক্ষা। গণমাধ্যমের শক্তি কেবল সংবাদ প্রকাশে নয়, তার নৈতিক অবস্থানেও। একটি সংবাদপত্র তখনই প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে, যখন মানুষ বুঝতে পারে, এর নিজস্ব কণ্ঠ আছে, নিজস্ব বিবেক আছে এবং প্রয়োজনে একা দাঁড়ানোর সাহস আছে।
বিশ্বখ্যাত TIME Magazine-এর ইতিহাসও আমাদের এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। TIME ১৯২৭ সাল থেকে “Person of the Year” নির্বাচন শুরু করে। প্রথম নির্বাচিত ব্যক্তি ছিলেন চার্লস লিন্ডবার্গ, যিনি এককভাবে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছিলেন। এই ঐতিহ্য দেখায়, ব্যক্তি অনেক সময় একটি সময়, একটি সংকট, একটি জাতি কিংবা একটি পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
বাংলাদেশের একটি সাংবাদিক প্রতিনিধি দল TIME Magazine-এর প্রধান কার্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, কেন TIME এত ব্যক্তি-কেন্দ্রিক cover story তৈরি করে। প্রধান সম্পাদক সংক্ষেপে উত্তর দিয়েছিলেন, “ব্যক্তি ইতিহাস সৃষ্টি করে।”
এই একটি বাক্যের মধ্যেই গণমাধ্যমের একটি গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে। সমষ্টি ইতিহাসের ক্ষেত্র তৈরি করে, কিন্তু ব্যক্তি অনেক সময় সেই ইতিহাসকে ভাষা দেয়, গতি দেয়, প্রতীক হয়ে ওঠে। “মুখপাত্র” ধারণাটিও সেই দর্শনেরই অংশ। এটি ব্যক্তিপূজা নয়, এটি প্রতিনিধিত্বশীল কণ্ঠের স্বীকৃতি।
বাংলা পত্রিকায় ইংরেজি slogan ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু ভাষা এখানে মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো editorial identity। BBC বাংলা বাংলা ভাষায় সম্প্রচার করলেও BBC-এর ঐতিহাসিক motto “Nation Shall Speak Peace Unto Nation” ইংরেজিতেই বহন করে। বিশ্বের বহু প্রতিষ্ঠান তাদের স্থানীয় ভাষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক editorial language ব্যবহার করে। আমাদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, slogan কি আমাদের দর্শনকে বহন করছে? আমরা বিশ্বাস করি, করছে।
“দৈনিক মুখপাত্র” শুধু একটি সংবাদপত্র নয়। এটি একটি সম্পাদকীয় অঙ্গীকার। আমরা বিশ্বাস করি, সংবাদপত্রের দায়িত্ব শুধু তথ্য প্রকাশ নয়, বরং সময়ের সামনে নিজের নৈতিক অবস্থানও ঘোষণা করা। আমরা সংবাদ প্রকাশ করব, কিন্তু শুধু তথ্যের বাহক হয়ে থাকব না। আমরা মানুষের কথা বলব, কিন্তু শুধু প্রতিধ্বনি হব না। আমরা সত্যের পক্ষে দাঁড়াব, কিন্তু অস্পষ্ট ভাষায় নয়, স্পষ্ট উচ্চারণে।
এই কারণেই আমাদের slogan “The Spokesman of Bangladesh”। এটি কোনো অলংকারমূলক বাক্য নয়। এটি দায়িত্ববোধের ঘোষণা। সমালোচনা থাকবে, মতভেদ থাকবে, প্রশ্ন থাকবে। সেটিই স্বাভাবিক। কারণ দৃঢ় অবস্থান কখনোই সবার কাছে আরামদায়ক হয় না। কিন্তু ইতিহাসে শেষ পর্যন্ত তারাই টিকে থাকে, যারা নিজেদের অবস্থানকে ভয় পায় না।
দৈনিক মুখপাত্র বিশ্বাস করে, সাহসী সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ প্রকাশ করে না; এটি সময়ের সামনে নিজের অবস্থানও ঘোষণা করে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬