
কলকাতা প্রতিনিধি
কলকাতা থেকে নতুন করে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে রাস্তায় নামাজ পড়ার বিষয়টি। বিজেপি নেতা অর্জুন সিং দাবি করেছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে রাস্তায় নামাজ পড়া বরদাস্ত করা না হয়। এই বক্তব্য সামনে আসার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইন্ডিয়া টুডে টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্জুন সিং বলেন, “মসজিদে নামাজ পড়লে আপত্তি নেই, কিন্তু রাস্তায় নামাজ পড়া যাবে না।” একই সঙ্গে তিনি গরু পাচার, চোরাকারবার এবং পুলিশের ওপর হামলার বিরুদ্ধেও সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন। তার এই বক্তব্য ঘিরেই মূল বিতর্কের সূত্রপাত।
তবে প্রশাসনের ভেতরের সূত্র বলছে, বিষয়টি সরাসরি “নামাজ নিষিদ্ধ” করার নয়। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রাস্তা আটকে যে কোনও ধর্মীয় উপাসনা বা জমায়েত নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ নির্দেশনা শুধু মুসলিমদের নামাজ নয়, দুর্গাপূজা, শোভাযাত্রা বা অন্য ধর্মীয় আয়োজনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।
প্রশাসনের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। বিশেষ অনুষ্ঠান যেমন ঈদ, রমজান বা দুর্গাপূজার ক্ষেত্রে আগের মতো অনুমতি সাপেক্ষে রাস্তা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।
এই বিতর্কে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কলকাতার ঐতিহাসিক রেড রোড। প্রতি ঈদে হাজার হাজার মুসল্লির জমায়েতে রেড রোড কার্যত বিশাল ঈদগাহে পরিণত হয়। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও অতীতে সেখানে উপস্থিত হয়ে ভাষণ দিয়েছেন। যদিও রেড রোড সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ায় প্রতিবারই বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়।
গত বছরও রেড রোডে ঈদের নামাজের অনুমতি নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। প্রথমে সেনাবাহিনী অনুমতি না দিলেও পরে সিদ্ধান্ত বদলায়। সেই সময় বিজেপির একাধিক নেতা প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেছিলেন। ফলে বর্তমান বিতর্ককে অনেকেই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখছেন।
এদিকে নতুন সরকারের বৈঠকে আরও কিছু নির্দেশনা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। কলকাতা বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ের কাছে থাকা একটি মসজিদকে “সসম্মানে” সরিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে। বিজেপির দাবি, ওই স্থাপনা বিমান চলাচলের নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি করছে। বিজেপি আইটি সেলের প্রধান অমিত মালভিয়াও এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সরব হয়েছেন।
শুধু নামাজ নয়, মাইক ব্যবহারের শব্দসীমা নিয়েও প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিচ্ছে বলে জানা গেছে। পুলিশ সূত্র বলছে, ৬৫ ডেসিবেলের সীমা যেন কোনওভাবেই অতিক্রম না হয়, তা নিশ্চিত করতে নজরদারি বাড়ানো হবে। যদিও এ নির্দেশ ধর্মীয় বা রাজনৈতিক সব ধরনের মাইকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে বলে দাবি প্রশাসনের।
মানবাধিকারকর্মী শেখ আবদুল সেলিম অবশ্য মনে করেন, বিষয়টিকে অযথা সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, “অর্জুন সিংয়ের কথায় না নামাজ বন্ধ হবে, না আজান থেমে যাবে। মুসলমান সমাজ এতে আতঙ্কিত হবে না।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক ভোট রাজনীতি আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে এই বিতর্ক। একদিকে বিজেপি হিন্দুত্ববাদী অবস্থানকে আরও জোরালো করতে চাইছে, অন্যদিকে বিরোধীরা এটিকে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখছে।
তবে বাস্তবতা হলো, পশ্চিমবঙ্গে রাস্তা দখল করে ধর্মীয় আয়োজন নতুন কিছু নয়। দুর্গাপূজার প্যান্ডেল, জগদ্ধাত্রী পূজা, কার্তিক পূজা কিংবা ঈদের জামাত—সব ক্ষেত্রেই বছরের পর বছর ধরে রাস্তা ব্যবহার হয়ে আসছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনের এই নতুন কঠোরতা আদৌ সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে, নাকি তা রাজনৈতিক বিতর্কের নতুন অস্ত্র হয়ে উঠবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬