নিউজউইক অবলম্বনে মুখপাত্র ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা, চিকিৎসা, ভ্রমণ বা কাজের স্বপ্ন বহু মানুষের। কিন্তু সেই স্বপ্নের দরজায় এবার যুক্ত হতে পারে নতুন এক কঠিন পরীক্ষা। মার্কিন ভিসা আবেদনকারীদের কাছে এখন জানতে চাওয়া হতে পারে, তারা কি নিজ দেশে কোনো ক্ষতি বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কিংবা দেশে ফিরতে ভয় পান কি না। আপাতদৃষ্টিতে প্রশ্ন দুটি মানবিক মনে হলেও এর উত্তরই অনেকের ভিসা ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিউজউইকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক নির্দেশনায় দূতাবাস ও কনস্যুলেট কর্মকর্তাদের ভিসা সাক্ষাৎকারে দুটি নতুন প্রশ্ন করতে বলা হয়েছে। প্রশ্নগুলো হলো, আবেদনকারী নিজ দেশে কোনো ক্ষতি বা দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন কি না এবং নিজ দেশে ফিরে যেতে ভয় পান কি না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো আবেদনকারী এসব প্রশ্নের উত্তরে আশঙ্কা প্রকাশ করলে তার অস্থায়ী বা নন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা আবেদন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এই পরিবর্তনের পেছনে আছে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির বড় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, অনেক ব্যক্তি পর্যটক, শিক্ষার্থী বা কর্মভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে পরে আশ্রয় আবেদন করেন। প্রশাসনের যুক্তি, ভিসা প্রক্রিয়ার শুরুতেই আবেদনকারীর সম্ভাব্য আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা যাচাই করা দরকার। সে কারণেই সাক্ষাৎকারে এমন প্রশ্ন যুক্ত করা হচ্ছে, যা আবেদনকারীর দেশে ফেরার ইচ্ছা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করবে।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে নন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা আবেদনকারীদের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে পর্যটক, শিক্ষার্থী, সাময়িক শ্রমিক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং এইচ ওয়ান বি কর্মীসহ নানা শ্রেণির আবেদনকারী। যারা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য নয়, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যেতে চান, তাদের ক্ষেত্রেই এই কড়াকড়ি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ নন ইমিগ্র্যান্ট ভিসার অন্যতম শর্ত হলো আবেদনকারীর নিজ দেশে ফেরার দৃঢ় ইচ্ছা থাকতে হবে।
তবে এই নীতির মানবিক দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকেরা বলছেন, পৃথিবীর অনেক দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত, নিপীড়ন বা সামাজিক সহিংসতার বাস্তবতা আছে। কেউ সত্যিই যদি নিজের দেশে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে তার সত্য বলা কি তাকে ভিসা থেকে বঞ্চিত করবে? আবার মিথ্যা বললে পরে ধরা পড়লে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে আবেদনকারীরা পড়তে পারেন এক ধরনের নৈতিক ও আইনি সংকটে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে আশ্রয়প্রার্থীদের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু নতুন প্রশ্নগুলো সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে কঠোর নিরাপত্তা নীতির সংঘাতকে সামনে আনছে। একদিকে প্রশাসনের দাবি, অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকানো জরুরি। অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, এই প্রক্রিয়া বিপদে থাকা মানুষদের আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা, ব্যবসা, চিকিৎসা, পর্যটন ও কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বহু মানুষ আবেদন করেন। সাক্ষাৎকারে এখন শুধু ব্যাংক স্টেটমেন্ট, আমন্ত্রণপত্র বা ভ্রমণ পরিকল্পনা নয়, নিজের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও সাবধানে এবং সত্যভিত্তিক উত্তর দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিসা সাক্ষাৎকারে অস্পষ্ট, অতিরঞ্জিত বা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই আবেদনকারীদের উচিত ভ্রমণের উদ্দেশ্য, দেশে ফেরার কারণ, পারিবারিক ও পেশাগত সংযোগ এবং আর্থিক সক্ষমতা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা। একই সঙ্গে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় সত্য গোপন বা সাজানো গল্প বলার প্রবণতা থেকে দূরে থাকা জরুরি।
শেষ পর্যন্ত এই নতুন প্রশ্ন দুটি শুধু ভিসা ফরমের অংশ নয়। এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন দর্শনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আগে যেখানে আবেদনকারীর আর্থিক সামর্থ্য ও ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল সবচেয়ে বড় বিবেচ্য, এখন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা অনুভূতিও সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে উঠছে। ফলে মার্কিন ভিসা আবেদন এখন আরও সংবেদনশীল, আরও রাজনৈতিক এবং আরও জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬