
রংপুর প্রতিনিধি
রংপুরের বদরগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র উত্তম কুমার সাহার বিরুদ্ধে দায়িত্বকালীন সময়ে ভারতীয় দুই নাগরিককে অবৈধভাবে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে জন্মসনদ প্রদান এবং তাদের মায়ের নামে জাল মৃত্যু সনদ ইস্যুর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সনদ ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় নিরাপত্তা তিনটি ক্ষেত্রেই গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বারাকপুর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা রাজ কুমার সাহার দুই ছেলে মনোজ কুমার সাহা (রানা) ও রাজীব কুমার সাহাকে বদরগঞ্জ পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা দেখিয়ে ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট পৃথকভাবে জন্মসনদ প্রদান করা হয়। মনোজ কুমারের জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৮০ সালের ১০ নভেম্বর এবং রাজীব কুমারের জন্ম তারিখ ১৯৮৩ সালের ২১ ডিসেম্বর।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, উভয়ের কাছেই বৈধ ভারতীয় পাসপোর্ট রয়েছে এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাস করছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, জন্ম নিবন্ধন বইয়ের নির্দিষ্ট নম্বর ও নিবন্ধন নম্বর সংযুক্ত করে বিষয়টি প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে ১৯৯৫ সালে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পূর্বে কোনো জন্মসনদ ইস্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি যা সাবেক মেয়রের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
শুধু জন্মসনদ নয়, তাদের মা আরতী রানী সাহার মৃত্যুসনদ নিয়েও রয়েছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ। অভিযোগে বলা হয়, তিনি ভারতের কলকাতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু একই তারিখে ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি বদরগঞ্জ পৌরসভা থেকে তার নামে মৃত্যুসনদ ইস্যু করা হয়। অভিযোগকারীর ভাষ্য, এটি পরিকল্পিত জালিয়াতির অংশ, যার মাধ্যমে সম্পত্তি সংক্রান্ত জটিলতা সহজ করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজ কুমার সাহা পরিবারের নামে বদরগঞ্জ পৌর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রায় শত কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদের মালিকানা ও আইনি বৈধতা নিশ্চিত করতে প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় জাল জন্ম ও মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে সাবেক মেয়রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা, তার নামাঙ্কিত সীল ও স্বাক্ষর ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
এ ঘটনায় বদরগঞ্জ পৌরসভার বাসিন্দা প্রদীপ কুমার সাহা গত বছরের ১২ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এর আগে ২০২৩ সালের ২৮ জুন একই বিষয়ে আরেকটি অভিযোগ করা হলেও তা রহস্যজনকভাবে অগ্রগতি পায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারী প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, উত্তম কুমার সাহার দায়িত্বকাল ছিল অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ভরপুর। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এসব বিষয় চাপা পড়ে ছিল। আমরা চাই, দুদক নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করুক। তিনি আরও অভিযোগ করেন, তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত করতে গোপনে আর্থিক লেনদেনের চেষ্টা হয়েছে।
অভিযুক্ত সাবেক মেয়র উত্তম কুমার সাহা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তারা ভারতীয় নাগরিক নয়। তাদের বাবা মা পৌরসভায় ছিলো দীর্ঘদিন সেই অনুযায়ী তাদের জন্ম নিবন্ধন দিয়েছি। ইউনিয়ন পরিষদ থাকাকালে ১৯৯৫ সালে তাদের জন্মসনদ দেওয়া হয়েছিল। সেই রেফারেন্সেই পৌরসভা থেকে নতুন সনদ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই সময়ের কোনো নথি খুঁজে পাওয়া যায়নি। পৌরসভার জন্ম নিবন্ধন যাচাইকারী কর্মকর্তা মনজুর রহমান বলেন, সাবেক মেয়র সই করতে বলেছিলেন, তাই আমি সই করেছি। উনি মেয়র ওনার কথা তো আমাকে শুনতে হবে। দুদকের রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. শাওন মিয়া জানান, ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং একজন কর্মকর্তাকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক আঞ্জুমান সুলতানার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বলেন, সাবেক মেয়র ছিলো তিনি কি করেছে আমি তো এ বিষয়ে জানিনা। তবে এ বিষয়ে তদন্ত চলমান আছে সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি কেবল একটি পৌরসভার অনিয়ম নয় বরং জাতীয় পরিচয় ও নাগরিক নিবন্ধন ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে। বিদেশি নাগরিককে বাংলাদেশি হিসেবে বৈধতা দেওয়ার মতো ঘটনা ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা করছেন। তারা দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬