জুলফিকার আলী কানন, মেহেরপুর থেকে
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অনন্য নাম মুজিবনগর। যে মাটিতে দাঁড়িয়ে জন্ম নিয়েছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন, যে আম্রকাননে উচ্চারিত হয়েছিল মুক্তির শপথ, সেই মুজিবনগর আজও ইতিহাসের মহিমা বয়ে চলেছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সেই গৌরবের প্রতীক মুজিবনগর স্মৃতিকেন্দ্র আজ ভাঙচুরের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীরব সাক্ষী হয়ে।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল—বাংলার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনে মুজিবনগরের আম্রকাননে শপথ নেয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার। সৈয়দ নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন, আর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয় স্বাধীনতার রাজনৈতিক ভিত্তি। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোকে ধারণ করে নির্মিত হয়েছিল মুজিবনগর স্মৃতিকমপ্লেক্স, যেখানে ভাস্কর্য, ম্যুরাল আর স্থাপনার মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা।
প্রায় ২৫ বছর আগে ৬০ একর জমির ওপর প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা এই স্মৃতিকেন্দ্র একসময় ছিল দেশি, বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে, নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের সাথে পরিচয় করাতে প্রতিদিন ভিড় করতেন অসংখ্য মানুষ। মুজিবনগরকে ঘিরেই মেহেরপুর পরিচিতি পেয়েছিল স্বাধীনতার স্মৃতিবিজড়িত জেলা হিসেবে।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী সময় এই গৌরবময় স্থাপনাটি নৃশংস ভাঙচুরের শিকার হয়। রড, বাঁশ ও হাতুড়ি নিয়ে একদল দুর্বৃত্ত ঢুকে পড়ে স্মৃতিকমপ্লেক্সে। একে একে ভেঙে ফেলা হয় মুক্তিযুদ্ধের নানা ভাস্কর্য—গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ইতিহাসের শিল্পরূপ।
যে ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছিল গার্ড অব অনার গ্রহণের দৃশ্য, আজ তার হাত ভাঙা। আনসার সদস্যদের রাইফেল ভেঙে টুকরো করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের প্রতীকী উপস্থাপনাও রক্ষা পায়নি ধ্বংসযজ্ঞ থেকে। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ কিংবা স্বাধীনতার বিভিন্ন মুহূর্ত সবই আজ ভাঙা, ক্ষতবিক্ষত স্মৃতিচিহ্নে পরিণত।
ভাঙচুরের পর থেকে দর্শনার্থীদের আনাগোনা প্রায় বন্ধ। ফলে স্মৃতিকমপ্লেক্স ঘিরে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র ব্যবসাও পড়ে গেছে মুখ থুবড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা সুরজ মন্ডল ও মহিন আলী জানান, “পর্যটক না আসায় আমাদের ব্যবসা বন্ধের পথে।” একই কথা বলেন ভ্যান চালক রহিম উদ্দীন, যিনি আগে প্রতিদিন পর্যটক ঘুরিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন, এখন তার দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়।
গণপূর্ত বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই স্মৃতিকেন্দ্রের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। সংস্কারের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হলেও এখনো তা মেলেনি। এক বছর পেরিয়ে গেলেও শুরু হয়নি দৃশ্যমান কোনো সংস্কার কার্যক্রম।
মুজিবনগর শুধু একটি স্থান নয়—এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি, স্বাধীনতার চেতনার উৎস। ভাঙচুরের ক্ষতচিহ্ন মুছে ফেলা শুধু অবকাঠামোগত কাজ নয়, এটি আমাদের ইতিহাস, আমাদের গৌরব এবং আমাদের আত্মমর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন।
মুজিবনগর দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে রয়েছে ত্যাগ, সংগ্রাম আর অদম্য সাহসের ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে সম্মান জানাতে হলে মুজিবনগর স্মৃতিকেন্দ্রকে তার পূর্বের রূপে ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।
ভাঙা দেয়াল, ক্ষতবিক্ষত ভাস্কর্য হয়তো ইতিহাসকে থামাতে পারে না, কিন্তু আমাদের দায়িত্বহীনতার সাক্ষ্য বহন করে। তাই এখনই প্রয়োজন দ্রুত সংস্কার, সংরক্ষণ এবং যথাযথ উদ্যোগ—যাতে আগামী প্রজন্ম গর্বের সঙ্গে বলতে পারে, “এই মাটিতেই জন্ম হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের।”
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬