বিশেষ প্রতিনিধি
জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী বিল পাস হওয়ায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থাকছে। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ এখন আইনি ভিত্তি পেল এবং দলটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকল।
সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ১১ মে অন্তর্বর্তী সরকার ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। পরদিন ১২ মে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। নতুন আইনের মাধ্যমে সেই অধ্যাদেশই স্থায়ী রূপ পেল।

সংশোধিত আইনে কোনো সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পাশাপাশি তাদের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করার স্পষ্ট বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বিলের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, ওই সত্তা কর্তৃক বা তার পক্ষে বা সমর্থনে কোনো প্রেস বিবৃতির প্রকাশনা বা মুদ্রণ, গণমাধ্যম, অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোনো ধরনের প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন আয়োজন বা জনসম্মুখে বক্তৃতা দেওয়া নিষিদ্ধ করা যাবে। অর্থাৎ নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতাই এখন শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়বে।
সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে তিনি বিলটি অবিলম্বে বিবেচনা ও পাসের প্রস্তাব তুললে কণ্ঠভোটে তা গৃহীত হয়। বিলের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “এটি একটি গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধনী। জনমতের ভিত্তিতেই এ পরিবর্তন আনা হয়েছে।” এর আগে তিনি বিবিসি বাংলাকেও বলেছিলেন, “অধ্যাদেশটি কিছু সংশোধনীসহ পাশের সুপারিশ করা হয়েছে।”
বিল পাসের আগে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ চান। তিনি বলেন, “আমরা বিলটি হাতে পেয়েছি মাত্র কয়েক মিনিট আগে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি আইনের ক্ষেত্রে আরও সময় দেওয়া উচিত ছিল।” সংসদে তিনি আরও বলেন, একটি শিট তারা তিন থেকে চার মিনিট আগে হাতে পেয়েছেন, এখনও পড়ে উঠতে পারেননি, আর আইনটি যেহেতু স্পর্শকাতর, তাই বিলটি পাসের আগে কিছুটা সময় রাখা দরকার ছিল।
জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “এই পর্যায়ে এসে আপত্তি করার সুযোগ নেই। বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে প্রস্তাব দিতে হতো, যা দেওয়া হয়নি।” রুলিংয়ে তিনি আরও বলেন, বিলের এই স্টেজে এসে আপত্তি করার সুযোগ নেই।
বিলের মাধ্যমে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ ও ২০ ধারা সংশোধন করা হয়েছে। ফলে সরকার কোনো সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পাশাপাশি তাদের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করতে পারবে এবং সংশ্লিষ্ট অর্থ, সম্পদ, লেনদেন ও প্রচারণা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবে। সংসদে পাস হওয়া আইনে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের মূল বিষয়বস্তুর কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। অর্থাৎ কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার যে বিধান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্ত করা হয়েছিল, সেটিই এখন আইনে বহাল থাকল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইন করে একটি দলকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, গণতান্ত্রিক চর্চা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এখানে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তো কোনো মামলা হয়নি। কিংবা আদালত তো আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেনি। এখন এটি দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার যে একটি দলকে রাষ্ট্র নিষিদ্ধ করবে নাকি জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ পাবে। ভোটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যাত হলে প্রতিহিংসার সুযোগ উঠতো না।” তিনি আরও বলেন, “আওয়ামী লীগ একাত্তরেও নিষিদ্ধ হয়েছিল। এখন মামলা হলে আদালত রায় দিত। কিন্তু সরকার সে পথেও যাচ্ছে না। জনগণ ভোট না দিলে দলটি ব্রাত্য হয়ে পড়তো। কিন্তু সরকার ও সমমনা দলগুলো এখনো আওয়ামী লীগকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে নিষিদ্ধ করে রাখতে চাইছে বলেই এটিকে প্রতিহিংসা মনে হতে পারে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা ঐতিহাসিকভাবেই কখনো কারও জন্য সুফল বয়ে আনেনি, বরং যারা করেছে তাদের ঐতিহাসিক দায় নিতে হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “এদেশে আওয়ামী লীগের অনেক ভোটার ও সমর্থক আছে। মানুষ দলটিকে গ্রহণ করবে কি না সেটি যাচাই করার সুযোগ অন্তর্বর্তী সরকার নষ্ট করেছে। কোনো অর্থেই রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম বন্ধ করা বা দল নিষিদ্ধ করা কাউকে সাময়িক তৃপ্তি কিংবা প্রতিহিংসা মেটানোর স্বাদ দিতে পারে কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে দেশ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এটি মোটেও ভালো পদক্ষেপ নয়।”
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা এসেছে। আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় দেওয়া বিবৃতিতে বলেন, “বিএনপিকে দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পূর্ণ দায় নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে এর ফলে যে পরিণতি হবে, তা বিএনপিকেই ভোগ করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “ভুলে গেলে চলবে না যে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে যে ব্যাপক সমর্থন রয়েছে, তা অত্যন্ত শক্তিশালী। মনে রাখবেন, জনমত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এই পরিবর্তন ইতোমধ্যেই আরও তীব্র হতে শুরু করেছে।” একই বিবৃতিতে তিনি বলেন, “এই বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য সংগ্রাম করার উচ্চতর নৈতিক অবস্থান অর্জন করবে। দেশকে স্বৈরাচারের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য আওয়ামী লীগ দেশের জনগণকে সাথে নিয়েই লড়াই করবে।”
সব মিলিয়ে সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এখন আইনি কাঠামোর মধ্যে স্থায়ী রূপ পেল। তবে এই সিদ্ধান্ত দেশের রাজনীতিকে স্থিতিশীল করবে, নাকি নতুন বিভাজন তৈরি করবে, সেই প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬