আলী কদর পলাশ
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যেখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং তা আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন। ইরানকে উদ্দেশ্য করে তাঁর ব্যবহৃত অশালীন ভাষা এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংসের প্রকাশ্য হুমকি একজন রাষ্ট্রনায়কের কাছ থেকে কোনোভাবেই কাম্য নয়। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া তাঁর বার্তাগুলো কেবল রাজনৈতিক উত্তাপই ছড়াচ্ছে না বরং তা সমগ্র বিশ্বকে এক ভয়াবহ ও অনিশ্চিত সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে। আধুনিক যুগে যখন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধ মেটাতে কূটনীতি ও সংলাপই প্রধান হাতিয়ার হওয়ার কথা, সেখানে এমন রণদেহী আস্ফালন সভ্যতার পশ্চাৎগামিতারই নামান্তর।
সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যাচ্ছে, ইরানকে উদ্দেশ্য করে ডনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক শব্দ ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে দেশটির জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোয় হামলার যে হুমকি তিনি দিয়েছেন, তা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক যুদ্ধের নীতিমালার পরিপন্থী। ‘পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে’ বা ‘ব্রিজ ডে’-র মতো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি পালনের হুমকি দিয়ে তিনি মূলত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। বিদ্যুৎকেন্দ্র বা সেতু ধ্বংসের অর্থ হলো সাধারণ মানুষের জীবন স্থবির করে দেওয়া, যা শেষ পর্যন্ত একটি মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিতে বাধ্য।
ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে শুরু হওয়া এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই তেল ও গ্যাস পরিবহন পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই সংকটের অর্থনৈতিক ধাক্কা কেবল মধ্যপ্রাচ্য বা আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অথচ এই সংকট নিরসনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভূমিকা কোনোভাবেই গঠনমূলক নয়। বরং তিনি বারবার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে এবং মিত্র দেশগুলোর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছেন। ইউরোপ ও ন্যাটো মিত্ররা যখন এই যুদ্ধকে বৈধতা দিতে অস্বীকার করছে, তখন খোদ ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার হুমকি দেওয়া মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এক চরম অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ।
মার্কিন রাজনীতিকদের একাংশ খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতা নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা বিষয়টিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার বা বার্নি স্যান্ডার্সের মতো প্রবীণ রাজনীতিকরা যখন প্রেসিডেন্টের আচরণকে ‘উন্মত্ত পাগলের’ সঙ্গে তুলনা করেন, তখন বিশ্ববাসীর চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকে। সাবেক মিত্র মার্জোরি টেইলর গ্রিনের মন্তব্য এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য; তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, আমেরিকা ফার্স্ট নীতি মানে এই নয় যে অকারণে অন্য একটি দেশে যুদ্ধ শুরু করে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হবে। ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগ করে প্রেসিডেন্টকে অপসারণের আলোচনার যে সুর শোনা যাচ্ছে, তা মার্কিন প্রশাসনের ভেতরের গভীর ফাটলকেই নির্দেশ করে।
ইরান যখন যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ‘নতুন আইনি কাঠামোর’ কথা বলছে, তখন তাকে আলোচনার টেবিলে আনার পরিবর্তে গালিগালাজ ও বোমাবর্ষণের হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই সমাধান হতে পারে না। যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে কোনো দেশই দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হতে পারেনি, ইতিহাসের পাতায় তার বহু প্রমাণ রয়েছে। আস্ফালন ও গালিগালাজ দিয়ে জাতীয় মর্যাদা রক্ষা পায় না, বরং এতে রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থানই ক্ষুণ্ণ হয়।
আমরা মনে করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত অবিলম্বে এই অনর্থক যুদ্ধ ও হুমকি-ধামকির রাজনীতি বন্ধে কার্যকর ও সম্মিলিত ভূমিকা রাখা। জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোকে এই সংকটে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হবে। মার্কিন কংগ্রেসকেও নিশ্চিত করতে হবে যে, কোনো একজন ব্যক্তির খেয়ালিপনা যেন একটি বৈশ্বিক বিপর্যয়ের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ ইরানি জনগণের ওপর হামলার হুমকি দিয়ে তাদের ‘মুক্ত’ করার যে দাবি ট্রাম্প করছেন, তা স্ববিরোধী। আমরা আশা করি, শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং যুদ্ধের বিভীষিকা কাটিয়ে বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে যাত্রা করবে। শান্তির সপক্ষে বিশ্ববিবেক জাগ্রত হওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬