আলী কদর পলাশ
রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারসাম্য রক্ষা সহজ নয়। বিশেষ করে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই দায়িত্ব আরও জটিল হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তী সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর পর্যালোচনা সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। কোনটি থাকবে। কোনটি সংশোধন হবে। আর কোনটি বাদ যাবে। এই বাছাইয়ের মধ্যেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারিত হচ্ছে।
তবে এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে শুধু প্রশাসনিক যুক্তি থাকলেই চলবে না। থাকতে হবে জুলাই চেতনার প্রতিফলন। কারণ জুলাই ছিল কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়। এটি ছিল মানুষের প্রত্যাশার বিস্ফোরণ। জবাবদিহির দাবি। মানবিক রাষ্ট্রের আহ্বান। সেই চেতনা অক্ষুণ্ন রাখা এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
সংসদীয় বিশেষ কমিটি ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করেছে। এর মধ্যে ৯৮টি অপরিবর্তিত অবস্থায় এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে বিল হিসেবে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। কিছু অধ্যাদেশ উত্থাপন না করার এবং কয়েকটি রহিত করার প্রস্তাবও এসেছে। এটিকে কেবল প্রশাসনিক বাছাই হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া। নতুন বাস্তবতায় রাষ্ট্রকে সাজানোর প্রচেষ্টা।
অন্তর্বর্তী সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তখন জরুরি প্রয়োজন ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা ছিল। ফলে সব অধ্যাদেশ সমানভাবে পরিণত হবে এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। এখন সংসদের মাধ্যমে সেগুলোকে যাচাই করা হচ্ছে। এটি গণতান্ত্রিক পথ। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
তবে এখানেই আসে সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্ন। গণভোট। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার। দুদক। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। এসব বিষয় সরাসরি জনগণের অধিকার ও জবাবদিহির সঙ্গে জড়িত। এসব নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে সরকারকে খুব সতর্ক থাকতে হবে। এমন বার্তা দেওয়া যাবে না যে জবাবদিহির ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে।
একইভাবে বিচার বিভাগ সম্পর্কিত বিষয়গুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচারক নিয়োগ। সচিবালয়ের কাঠামো। এসব রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্যের কেন্দ্র। এখানে কোনো সিদ্ধান্তই হালকাভাবে নেওয়া যায় না। পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য।
সরকারের সমালোচকেরা বলছেন কিছু অধ্যাদেশ ক্ষমতা বাড়ায় তাই টিকে যাচ্ছে। আর জবাবদিহির বিষয়গুলো পিছিয়ে যাচ্ছে। এই প্রশ্নকে একেবারে অস্বীকার করা যাবে না। কারণ জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা এখনো মানুষের মনে জীবন্ত। সেই অভিজ্ঞতা মানুষকে সতর্ক করেছে। সচেতন করেছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা জরুরি। রাষ্ট্রকে কার্যকর রাখতে হবে। উন্নয়ন ও সেবা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে—জুলাই চেতনা এসেছে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার যেকোনো উদ্যোগে ভারসাম্য থাকতে হবে। ক্ষমতা ও জবাবদিহির মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।
সংসদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খোলামেলা আলোচনা দরকার। যুক্তির ব্যাখ্যা দরকার। জনগণকে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন আছে। কারণ গণতন্ত্র শুধু সিদ্ধান্তের নাম নয়। এটি আস্থারও নাম।
আজ সরকারের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে কার্যকর রাষ্ট্র কাঠামো বজায় রাখা। অন্যদিকে জুলাই চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা অটুট রাখা। এই দুইয়ের সমন্বয়েই আসবে গ্রহণযোগ্যতা। এই পথেই গড়ে উঠবে একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র।
সুতরাং বর্তমান অধ্যাদেশ পর্যালোচনা একটি সুযোগ। এটি শুধু আইনি প্রক্রিয়া নয়। এটি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পরীক্ষাও। সরকার যদি প্রমাণ করতে পারে যে তার পদক্ষেপ জুলাই চেতনার বিরোধী নয় বরং সেই চেতনাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিচ্ছে তবে এই প্রক্রিয়া সফল হবে। আর রাষ্ট্র পরিচালনায় কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্যও তখনই দৃশ্যমান হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬