
আল জাজিরা অবলম্বনে নিজস্ব প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার প্রভাব ধীরে ধীরে এসে পড়ছে বাংলাদেশের কৃষিতে। সার আমদানিতে অনিশ্চয়তা, দামের ঊর্ধ্বগতির আশঙ্কা এবং সময়মতো সরবরাহ না পাওয়ার উদ্বেগে নতুন মৌসুমের আগে চাপে পড়েছেন কৃষকেরা। সরকার আশ্বাস দিলেও মাঠের বাস্তবতায় বাড়ছে দুশ্চিন্তা।
দূরের সংঘাতের অভিঘাত এখন বাংলাদেশের মাঠেও এসে লাগছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর সেই সংকটের প্রথম ধাক্কাগুলোর একটি লেগেছে সার সরবরাহে।
বাংলাদেশের কৃষি এখন অনেকটাই আমদানিনির্ভর। ধান, গম, ভুট্টা, সবজি থেকে শুরু করে নানা ফসলের উৎপাদনে রাসায়নিক সারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহে টান পড়লে, আমদানি বিলম্বিত হলে কিংবা পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব খুব দ্রুত নেমে আসে স্থানীয় বাজারে। কৃষক তখন প্রথমেই টের পান অনিশ্চয়তা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আমদানি করা সারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এমন বাণিজ্যপথের সঙ্গে যুক্ত, যা হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে ওই অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়লে এ দেশের কৃষিও ঝুঁকির বাইরে থাকে না।
উত্তরাঞ্চলের কৃষকেরা বলছেন, বাজারে ইতোমধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। কখনো সার পাওয়া যাচ্ছে, কখনো পাওয়া যাচ্ছে না। আর পাওয়া গেলেও দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন মৌসুমের আগে চাষের খরচ কেমন দাঁড়াবে, তা নিয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না তারা।
কৃষকের সবচেয়ে বড় ভরসা হলো সময়মতো সার পাওয়া। কারণ জমিতে নির্দিষ্ট সময়ে সার দিতে না পারলে ফলনের ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। আবার দাম বেড়ে গেলে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম সার ব্যবহার করেন। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ফলন কমলে কৃষকের আয় কমে। সেই চাপ গিয়ে পড়ে পরিবারে, সংসারে, সন্তানের পড়াশোনায় ও দৈনন্দিন খরচে।
সরকারি পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এখনই বড় ধরনের সংকট নেই। কৃষি মন্ত্রণালয় পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। আসন্ন মৌসুমের জন্য প্রায় ৫ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিকল্প উৎস থেকেও সার সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। চীন ও মরক্কোর মতো দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে।
তবে সরকারি আশ্বাসের বাইরে মাঠের কৃষকেরা আরও সতর্ক। কারণ তারা জানেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রভাব আগে এসে পড়ে বাজারের আচরণে। খবর ছড়ালেই দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা দেয়। সরবরাহে সামান্য দেরি হলেও স্থানীয় পর্যায়ে কৃত্রিম চাপ তৈরি হতে পারে। আর সেই চাপ শেষ পর্যন্ত সামলাতে হয় কৃষককেই।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সার সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব শুধু উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। খাদ্যশস্যের ফলন কমে গেলে বাজারে দাম বাড়তে পারে। এতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে অধিকাংশ পরিবার আয়ের বড় অংশ খাদ্যে ব্যয় করে, সেখানে এই ঝুঁকি আরও স্পষ্ট।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট তাই বাংলাদেশের জন্য কেবল আন্তর্জাতিক খবর নয়। এটি কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত এক বাস্তব উদ্বেগ। মাঠের কৃষকের কাছে যুদ্ধের মানে শুধু দূরের গোলাবর্ষণ নয়। তার মানে সময়মতো সার মিলবে কি না, খরচ সামলানো যাবে কি না, আর মৌসুম শেষে ঘরে ফসল উঠবে কি না।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, বৈশ্বিক সংকটের ঢেউ শেষ পর্যন্ত এসে লাগে মাটির কাছেই। আর সেই মাটির মানুষই সবার আগে টের পান তার চাপ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬