
বিশেষ প্রতিবেদক
অস্ট্রেলিয়ায় সফররত বাংলাদেশি ইসলামি বক্তা ড. মিজানুর রহমান আজহারীর ভিসা বাতিল ও দেশত্যাগের নির্দেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, অতীতের বিতর্কিত বক্তব্য, বিশেষ করে ইহুদিবিরোধী ও উগ্র মন্তব্যের অভিযোগ ঘিরে জনমত ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ তার ভিসা বাতিল করে।
অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম News.com.au এবং Daily Telegraph–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, আজহারী “Legacy of Faith” শীর্ষক একটি বক্তৃতা সফরে অস্ট্রেলিয়ায় যান। তার সফরসূচিতে ব্রিসবেন, মেলবোর্ন, সিডনি ও ক্যানবেরাসহ একাধিক শহরে অনুষ্ঠান ছিল। তবে দেশটিতে পৌঁছানোর অল্প সময়ের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে অতীতের বক্তব্য নিয়ে আপত্তি জোরালো হয় এবং পরে তার ভিসা বাতিল করা হয়।
এসব প্রতিবেদনে আজহারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় যে, তিনি অতীতে ইহুদিদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন এবং অ্যাডলফ হিটলারের কর্মকাণ্ডকে “ঈশ্বরীয় শাস্তি” ধরনের ভাষায় উল্লেখ করেছিলেন। একই সঙ্গে কিছু প্রতিবেদনে হিন্দুধর্ম ও বাঙালি সংস্কৃতি নিয়েও তার বক্তব্যকে বিভাজনমূলক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী জোটের রাজনীতিক সেনেটর জনো ডুনিয়াম প্রকাশ্যে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিদেশি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ান জিউইশ অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশি সংখ্যালঘু-অধিকার সংশ্লিষ্ট একটি সংগঠনও তার সফর নিয়ে আপত্তি জানায়। পরে স্বরাষ্ট্র দপ্তর তার ভিসা বাতিলের পদক্ষেপ নেয় বলে সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি।
বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমেও একই ঘটনার প্রতিধ্বনি দেখা গেছে। ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ডেইলি সান, মানবজমিন এবং জাগো নিউজ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজহারীর অস্ট্রেলীয় ভিসা বাতিল করা হয়েছে এবং তাকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে বিদেশি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, তার অতীতের কথাবার্তা এবং উগ্র বা ইহুদিবিদ্বেষী মন্তব্যের অভিযোগই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
তবে এ ঘটনায় নিজের অবস্থান জানিয়ে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে আজহারী দাবি করেছেন, তাকে ঘিরে যে সংবাদ ছড়িয়েছে তা “বিদেশি একটি প্রতিবেদনের ভুল ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা।” তার ভাষ্য, ভিসা বাতিলের কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক কোনো বক্তব্যকে দায়ী করা “সম্পূর্ণ অসত্য”, কারণ তিনি এখনো অস্ট্রেলিয়ায় কোনো বক্তব্যই দেননি। তিনি আরও বলেন, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ও নাস্তিক্যবাদী পক্ষ পুরোনো এবং প্রেক্ষাপটহীন বক্তব্য তুলে ধরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেছে। একই পোস্টে তিনি নিজেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী বলেও উল্লেখ করেন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোও মূলত আজহারীর সাম্প্রতিক অস্ট্রেলিয়া সফরের বক্তব্য নয় বরং তার পুরোনো ভিডিও, পূর্ববর্তী মন্তব্য এবং অতীত বিতর্ক–কেই কেন্দ্র করে আপত্তির কথা বলেছে। ফলে আজহারীর ফেসবুক পোস্টে করা এই দাবি যে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে এখনো কোনো বক্তব্য দেননি- তা বিদেশি প্রতিবেদনের মূল কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক নয়; বরং বিতর্কটি বর্তমান সফরের আগের বক্তব্য ঘিরেই তৈরি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
তবে অস্ট্রেলিয়া সরকারের পক্ষ থেকে এই মুহূর্তে এমন কোনো প্রকাশ্য বিশদ বিবৃতি দৈনিক মুখপাত্র খুঁজে পাইনি, যেখানে আজহারীর ক্ষেত্রে ঠিক কোন আইনি ধারায় বা কোন নির্দিষ্ট নথির ভিত্তিতে ভিসা বাতিল করা হয়েছে, তা নামোল্লেখসহ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটে সাধারণভাবে বলা আছে, চরিত্রগত বা অন্যান্য কারণে ভিসা বাতিল হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অস্ট্রেলিয়া ছাড়তে হতে পারে, এমনকি আটক ও অপসারণের মুখেও পড়তে পারেন।
এর আগে যুক্তরাজ্যেও আজহারীর সফর ঘিরে বাধার খবর আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। সাম্প্রতিক অস্ট্রেলীয় প্রতিবেদনে সেই পুরোনো ঘটনাও পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু বাংলাদেশি মাধ্যমও জানিয়েছে, অতীতের বিতর্কের জেরে বিভিন্ন দেশে তার সফর প্রশ্নের মুখে পড়েছিল।
সব মিলিয়ে, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ায় আজহারীর ভিসা বাতিলের ঘটনায় দুটি আলাদা বয়ান সামনে এসেছে। একদিকে অস্ট্রেলীয় ও বাংলাদেশি একাধিক গণমাধ্যম বলছে, অতীতের ইহুদিবিরোধী ও বিভাজনমূলক বক্তব্যের অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপ এবং কমিউনিটি আপত্তির জেরে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। অন্যদিকে আজহারী নিজে দাবি করছেন, তার বিরুদ্ধে পুরোনো বক্তব্যকে প্রেক্ষাপটহীনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং সাম্প্রতিক সফরে তিনি এখনো কোনো বক্তব্যই দেননি। সরকারি পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিতর্কটি আরও চলবে বলেই মনে হচ্ছে।
সংক্ষিপ্ত সূত্রভিত্তিক নোট:
অস্ট্রেলীয় প্রতিবেদন: News.com.au, Daily Telegraph/The Chronicle।
বাংলাদেশি প্রতিবেদন: মানবজমিন–এর আলোচিত সংবাদ, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ডেইলি সান, জাগো নিউজ।
মাওলানা আজহারীর নিজস্ব ফেসবুক পোস্ট।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬