ইসলামী ইনস্যুরেন্সে ২১ কোটি টাকার অনিয়মিত ব্যয় ও নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ আইডিআরএ-এর মাত্র ৫ লাখ জরিমানা প্রশ্নের মুখে

Date:

spot_img

স্টাফ রিপোর্টার :

বীমা খাতে আর্থিক অনিয়ম, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে ইসলামী ইনস্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডকে ঘিরে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালে আয়ের তুলনায় প্রায় ২১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) মাত্র ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে—যা খাতসংশ্লিষ্টদের কাছে “অতি তুচ্ছ” ও “অকার্যকর” বলে বিবেচিত হচ্ছে।

আইডিআরএ-এর পরিচালন ও পরিদর্শন বিভাগ থেকে পাঠানো নোটিশে বলা হয়েছে, বীমা আইন, ২০১০-এর ধারা ৩৫ ও ৪০ অনুযায়ী কোনো বীমা কোম্পানি নির্ধারিত সীমার বাইরে ব্যয় পরিচালনা করতে পারে না। কিন্তু ইসলামী ইনস্যুরেন্স নীতিমালা লঙ্ঘন করে আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করেছে। ৬০ কোটির ব্যবসার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ ব্যয় করার অনুমতি ছিল ৪০ শতাংশ। কিন্তু তারা ব্যয় করেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ—যার ফলে নিয়মের অতিরিক্ত ৩৫ শতাংশ বা প্রায় ২১ কোটি টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়।

বীমা খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব ব্যয়ের বড় অংশ দেখানো হয়েছে ‘যোগ-ছায়া যোগে’, যা বাস্তবে অপচয় বা লোপাটের শামিল। এমন পরিস্থিতিতে ২১ কোটি টাকার অনিয়মের বিপরীতে মাত্র ৫ লাখ টাকার জরিমানাকে তারা দেখছেন “অপরাধীদের উৎসাহ দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত” হিসেবে। তাদের মতে, মোট অনিয়মের তুলনায় এই শাস্তির অঙ্ক দাঁড়ায় মাত্র ০.২৫ শতাংশ, যা কার্যত কোনো প্রভাবই ফেলবে না।

একের পর এক অনিয়মের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক আচরণ। অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানির সাবেক সিইও মো. আবদুল খালেকের বৈধ পাওনাদি পরিশোধ না করেই তাকে সরিয়ে দিয়ে অন্য একজনকে ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যা বীমা আইন, শ্রম আইন এবং কোম্পানির নিজস্ব নীতিমালারও পরিপন্থী।

বীমা খাত বিশেষজ্ঞদের দাবি, কোনো কোম্পানির সিইওকে পাওনাদি পরিশোধ ছাড়াই অপসারণ করা এবং নিয়ম বহির্ভূতভাবে অন্যজনকে ভারপ্রাপ্ত এমডি নিয়োগ দেওয়া—এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্নীতিই নয়, বরং সিন্ডিকেটভিত্তিক অপকর্মেরই বহিঃপ্রকাশ। তাদের মতে, “যেখানে ২১ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মকে তুচ্ছ জরিমানা দিয়ে পাশ কাটিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এমন অবিচার হওয়া অস্বাভাবিক নয়।”

অনেকে বলছেন, আইডিআরএ যদি প্রকৃত নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করত, তবে অনিয়মকারীরা এভাবে নির্বিঘ্নে নিয়ম ভাঙতে পারত না। তারা মনে করেন, ২১ কোটি টাকার অনিয়মিত ব্যয়ের বিপরীতে কমপক্ষে দ্বিগুণ জরিমানা ধার্য হওয়া উচিত ছিল। কঠোর শাস্তির মাধ্যমে দুর্নীতি বন্ধ করার পরিবর্তে অতি সামান্য জরিমানা আরোপ করায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আইডিআরএ-এর নোটিশে কোম্পানিকে ১৫ দিনের মধ্যে জরিমানার টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বীমা খাতসংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, জরিমানার অঙ্ক না বাড়ালে এবং নিয়মবহির্ভূত নিয়োগসহ প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে বীমা শিল্পে গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না।

বীমা খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে এখনই শক্ত অবস্থান না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে—এমনই মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...