বিশেষ প্রতিবেদক
ফেসবুকের একটি বিজ্ঞাপন। লেখা “দ্রুত আয় করুন। দিনে ৫% লাভ।” কেউ ক্লিক করলেন। কেউ বিনিয়োগ করলেন। কেউ সর্বস্ব হারালেন।
এই চিত্র এখন একক নয়।
এটি এখন একটি সংগঠিত অর্থ পাচার চক্রের গল্প।
সর্বশেষ ঘটনায়,
ফেসবুক ও ইউটিউবে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দ্রুত লাভের প্রলোভন দেখিয়ে পাচার হয়ে যাওয়া প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ফেরত এনছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডি। অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক প্ল্যাটর্ফম এমটিএফইয়ের (মেটারভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ) মাধ্যমে পাচার হওয়া এই ডলারের মূল্য প্রায় ৪৪ কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি। উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফরেক্স ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে এই অর্থ লুটে নেয় একটি অসাধু চক্র। গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর মালিবাগের সিআইডির সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানিয়েছেন সংস্থাটির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) ডিআইজি মো. আবুল বাশার তালুকদার।
তিনি বলেন, ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট রাজধানীর খিলগাঁও থানায় একটি প্রতারণার মামলা দায়ের হয়। মামলায় ভুক্তভোগী দাবি করেন, ‘এমটিএফই পনজি স্কিম’-এ বিনিয়োগ করে তিনি ২ লাখ টাকা প্রতারিত হয়েছেন। ওই ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে জানাতে পারি- ওই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অসংখ্য বিনিয়োগকারী কোটি কোটি টাকার প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তদন্তে আরো জানা যায়, ২০২২ সালের জুন থেকে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে এমটিএফই। ফেসবুক ও ইউটিউবে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দ্রুত লাভের প্রলোভন দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হয়।
ব্যবহারকারীদের ভার্চুয়াল ট্রেডিং অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল ডলার দেখানো হলেও বাস্তবে এসব লেনদেন ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। মূলত কৃত্রিমভাবে লাভ দেখিয়ে নতুন বিনিয়োগ আনাই ছিল ওই চক্রের মূল কৌশল। তিনি বলেন, শুরুতে কিছু অর্থ ফেরত দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করে চক্রটি।
পরে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ কার্যক্রম বন্ধ করে উধাও হয়ে যায় তারা। বিনিয়োগকারীদের অর্থ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটে স্থানান্তরের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়। প্রতারণার মাধ্যমে আদায়কৃত প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ ওকেএক্স-এ সংরক্ষিত ছিল। ব্লকচেইন বিশ্লেষণ টুল ব্যবহার করে এ অর্থের সঙ্গে প্রতারণা চক্রের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করা হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে এটি কেবল একটি প্ল্যাটফর্মের গল্প নয়। বরং একটি বৃহৎ ডিজিটাল প্রতারণা নেটওয়ার্কের অংশ।
এমটিএফই: ভার্চুয়াল লাভ, বাস্তব ক্ষতি
সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে এমটিএফই নামে একটি প্ল্যাটফর্মের নাম।
২০২২ সালে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে তারা।
ফেসবুক ও ইউটিউবে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিনিয়োগকারীদের টানে।
দেখানো হয় ফরেক্স ও ক্রিপ্টো ট্রেডিংয়ের স্বপ্ন।
প্রথমে কিছু লাভ দেওয়া হয়। তারপর বাড়ানো হয় বিনিয়োগ। কিন্তু বাস্তবে সব লেনদেন ছিল ভুয়া।
ডিজিটাল অ্যাকাউন্টে দেখানো ডলার ছিল কল্পিত।
২০২৩ সালের মাঝামাঝি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় প্ল্যাটফর্মটি। অর্থ চলে যায় বিদেশি ক্রিপ্টো ওয়ালেটে।
সিআইডি ব্লকচেইন বিশ্লেষণে খুঁজে পায় প্রায় ৩.৬ মিলিয়ন ডলার।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সেই অর্থ উদ্ধার সম্ভব হয়।
একই কৌশল, ভিন্ন নাম
অনুসন্ধানে দেখা গেছে এমটিএফই একা নয়। একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করছে আরও বহু প্ল্যাটফর্ম।
১. “ডাবল মানি” গ্রুপ
ফেসবুকে বন্ধ গ্রুপ।
ভিতরে সদস্যদের স্ক্রিনশট “আজ ১০ হাজারে ২০ হাজার।”
নতুনদের টানার জন্য সাজানো নাটক।
২. ইউটিউব ট্রেডিং কোর্স
ভিডিওতে “গ্যারান্টিড প্রফিট” দাবি। পেইড কোর্স কিনলে দেওয়া হয় ফেক সিগন্যাল। শেষে বিনিয়োগ হারিয়ে নিঃস্ব হন গ্রাহক।
৩. রোমান্স স্ক্যাম
বিদেশি পরিচয়ে ফেসবুকে বন্ধুত্ব। ভালোবাসার ফাঁদে টাকা দাবি। ডলার পাঠানোর নামে প্রতারণা।
৪. ই-কমার্স বিনিয়োগ
“রেফার করুন, আয় করুন” পনজি মডেলে নতুন সদস্য দিয়ে পুরনোদের টাকা ফেরত। শেষে সাইট বন্ধ।
৫. গিভঅ্যাওয়ে প্রতারণা
ফেসবুকে “লাইক দিন, ৫০ হাজার জিতুন” ব্যাংক তথ্য সংগ্রহ করে অ্যাকাউন্ট খালি।
কেন ধরা পড়ে না চক্র
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই চক্রগুলো অত্যন্ত সংগঠিত। তারা ব্যবহার করে, ভুয়া পরিচয়, বিদেশি সার্ভার, ক্রিপ্টোকারেন্সি,এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ,য়ফলে ট্র্যাক করা কঠিন হয়
অধিকাংশ অর্থ যায় বিদেশে। আইনগত প্রক্রিয়ায় ফেরত আনা জটিল।
নীরব ভুক্তভোগীর দেশ
সিআইডির মতে ভুক্তভোগীর প্রকৃত সংখ্যা অজানা। কারণ অনেকেই অভিযোগ করেন না। কারও সামাজিক ভয়। কারও লজ্জা। কারও অজ্ঞতা।
অনেকে জমি বিক্রি করেছেন। স্বর্ণ বিক্রি করেছেন। ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন।
শেষে হয়েছেন নিঃস্ব।
প্রতারণার মনস্তত্ত্ব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
এই প্রতারণার মূল অস্ত্র “লোভ”। দ্রুত লাভের স্বপ্ন দেখানো হয়। প্রথমে ছোট লাভ দিয়ে বিশ্বাস তৈরি।
তারপর বড় বিনিয়োগ টানা।
মানুষ ভাবে “অন্যরা পাচ্ছে, আমি কেন নয়।” এই মনস্তত্ত্বই ফাঁদকে সফল করে।
রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ
৪৪ কোটি টাকা উদ্ধার একটি বড় সাফল্য।
তবে এটি ব্যতিক্রম। কারণ সব ক্ষেত্রে এমন উদ্ধার সম্ভব হয় না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সামনে চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক সমন্বয়। প্রযুক্তিগত দক্ষতা। দ্রুত তথ্য সংগ্রহ
কী করতে হবে এখন
বিশেষজ্ঞদের পরামর্-
১. অতিরিক্ত লাভের প্রলোভনে সাড়া নয়।
২. যাচাই ছাড়া বিনিয়োগ নয়।
৩. সোশ্যাল মিডিয়ার বিজ্ঞাপনে সতর্কতা।
৪. সন্দেহজনক লেনদেন সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্ট।
শেষ কথা
ডিজিটাল বাংলাদেশে নতুন অর্থনীতি তৈরি হয়েছে। তার সঙ্গে তৈরি হয়েছে নতুন অপরাধ।
৪৪ কোটি টাকা ফিরে এসেছে। কিন্তু কত কোটি হারিয়েছে তার হিসাব এখনো অজানা।
প্রশ্ন একটাই আমরা কি শিখছি? নাকি আবারও একই ফাঁদে পা দিচ্ছি?
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬