আলী কদর পলাশ
শিশুর হাহাকার কখনও পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রের বিবেকের পরীক্ষা। দেশে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। শিশু মৃত্যুর খবর আসছে একের পর এক। 'দ্য ডেইলি স্টার'-এর খবরে বলা হয়েছে, চলতি মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যা শুধু উদ্বেগের নয়, গভীর ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি। একই সময়ে অন্যান্য সংবাদমাধ্যমেও অন্তত চার ডজন শিশু মৃত্যুর কথা উঠে এসেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই স্পষ্ট করে।
আরও আশঙ্কাজনক হলো টিকার সংকট। কেন্দ্রীয় গুদামে একাধিক রোগের টিকার মজুত শূন্যে নেমে যাওয়ার খবর জনমনে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। একটি দেশের শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এর চেয়ে বড় সতর্কসংকেত আর হতে পারে না। টিকা না থাকলে শুধু হাম নয়, আরও বহু প্রতিরোধযোগ্য রোগ নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, আগামী এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে হামের টিকা সরবরাহ শুরু হতে পারে। তিনি জানিয়েছেন, টিকা কেনার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, ইউনিসেফকে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে এবং ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণা অবশ্যই স্বস্তির। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই টিকা আসতে এত দেরি কেন হলো? আর এর মধ্যে যে শিশুরা আক্রান্ত হলো বা মারা গেল, তাদের দায় কে নেবে?
মন্ত্রী আরও বলেছেন, গত এক দশকে নিয়মিত টিকাদান চললেও ২০১৮ সালের পর বড় কোনো হামের টিকা ক্যাম্পেইন হয়নি। এখানেই সমস্যার মূল। নিয়মিত টিকা কার্যক্রম থাকলেও বড় আকারের ফলোআপ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকলে বহু শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়। যারা পরে জন্মেছে, যারা কোনো কারণে প্রথম ডোজ মিস করেছে কিংবা দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি। তাদের বড় অংশই ধীরে ধীরে ঝুঁকির বৃত্তে চলে গেছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। “আট বছর হামের টিকা দেওয়া হয়নি” -এমন বক্তব্য সঠিক নয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২০ সালেও হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন হয়েছে এবং নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রমও চলেছে। অর্থাৎ সমস্যা টিকা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা নয়; সমস্যা হলো কভারেজের ফাঁক, ড্রপআউট, বিলম্বিত ক্যাম্পেইন এবং সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।
সুতরাং আর দেরি নয়, অজুহাত নয়; আজ সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে তিনটি জায়গায়:
প্রথমত, টিকা দ্রুত আনতে হবে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের প্রতিশ্রুতি কেবল কাগজে নয়, মাঠে দৃশ্যমান হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, 'মিসড' ও 'ড্রপআউট' শিশুদের জরুরি তালিকা করতে হবে। যে শিশুরা প্রথম ডোজ পেয়েছে কিন্তু দ্বিতীয় ডোজ পায়নি, তাদের খুঁজে বের করা এখনই জরুরি।
তৃতীয়ত, হাসপাতাল প্রস্তুতি ও জনসচেতনতা একসঙ্গে বাড়াতে হবে। আইসিইউ, আইসোলেশন, ভেন্টিলেটর যেমন দরকার, তেমনি দরকার অভিভাবকদের কাছে এই স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে- টিকাই জীবন বাঁচায়।
বাংলাদেশ একসময় টিকাদানে সাফল্যের বিশ্বসেরা উদাহরণ ছিল। সেই দেশেই যদি হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশু মৃত্যু বাড়ে, তবে সেটি কেবল স্বাস্থ্য খাতের ব্যর্থতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারহীনতার এক নির্মম প্রমাণ।
একটি শিশুর মৃত্যু মানে একটি পরিবারের আলো নিভে যাওয়া। ৪১টি শিশু মৃত্যু মানে ৪১টি ঘর শোকাতুর। এই শোককে আমরা কেবল সংবাদ শিরোনাম হতে দিতে পারি না।
এখন দরকার দায় স্বীকার, দ্রুত ব্যবস্থা এবং টিকাকে ঘিরে নতুন জাতীয় জরুরি উদ্যোগ। কারণ, শিশুদের বাঁচানো দয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য।
৩০ মার্চ ২০২৬
ইস্পাহানী আই হসপিটাল, চোখের অপারেশনের ৮ ঘণ্টা পর কেবিন থেকে লেখা
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬