তুহিন ফরাজী, ভোলা প্রতিনিধি
ভোলার লালমোহনে পৈতৃক ভিটা রক্ষার লড়াই আজ পরিণত হয়েছে তিন এতিম বোনের জীবনের সবচেয়ে নির্মম দুঃস্বপ্নে। বাবার মৃত্যুর পর যে চাচার বুকে তারা খুঁজে পেতে পারত নিরাপত্তা, সেই চাচার হাতেই আজ তারা রক্তাক্ত, অসহায়, নিঃস্ব।
দফায় দফায় হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন তিন বোন। তাদের মধ্যে একজন নারী সাংবাদিক—যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেন, আজ নিজেই অন্যায়ের নির্মম শিকার। তাদের কান্না, তাদের আর্তনাদ যেন নীরবে কাঁদাচ্ছে পুরো এলাকা।
ঘটনাটি ঘটে গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) ও বুধবার (২৫ মার্চ) উপজেলার রমাগঞ্জ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মনু হাওলাদার বাড়িতে।
অভিযোগ উঠেছে, চাচা ইসমাইল হাওলাদার তার সহযোগীদের নিয়ে দেশীয় অস্ত্রসহ এই বর্বর হামলা চালান।
আহতরা হলেন—মৃত আব্দুল হামিদের তিন মেয়ে কুলসুম (৩২), জিনাদ নুসাইবা (২৫) ও রাবেয়া (২২)। গুরুতর আহত কুলসুম বর্তমানে লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। নুসাইবা ‘Chdnews24’সহ বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (MRA)-এর সঙ্গে যুক্ত—যিনি আজ নিজেই সংবাদ, কিন্তু তার কণ্ঠে নেই প্রতিবাদের শক্তি, আছে শুধু বেঁচে থাকার আর্তনাদ।
প্রায় দুই যুগ আগে বাবার মৃত্যু—সেই থেকেই শুরু তাদের দুঃখের যাত্রা। উপার্জনের কেউ ছিল না, মাথার ওপর ছিল না কোনো ছায়া। মা শাহানুর তিনটি ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে আশ্রয় নেন চট্টগ্রামে। দারিদ্র্য আর বেঁচে থাকার সংগ্রামে বড় হতে থাকে তিনটি কচি প্রাণ।
কিন্তু তাদের শূন্য বাড়িটি একা থাকেনি। অভিযোগ, সেই শূন্যতাকেই সুযোগ বানিয়ে পৈতৃক ভিটা দখলে নেন আপন চাচা ইসমাইল হাওলাদার। বছরের পর বছর তিনি ভোগ করতে থাকেন সেই জমি—যেখানে ছিল তিন বোনের শৈশব, স্মৃতি আর বাবার ভালোবাসা।
তিন বছর আগে বড় হয়ে যখন তারা ফিরে আসে নিজেদের শিকড়ে, তখনও বুকভরা আশা—
“নিজেদের ঘরে ফিরব, শান্তিতে থাকব।”
সালিশের মাধ্যমে তারা ছোট্ট একটি ঘর তোলে। কিন্তু সেই ঘরই যেন হয়ে ওঠে তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ।
মঙ্গলবার, একেবারেই সাধারণ একটি দিন। কুলসুমের ছোট্ট শিশুপুত্র পুকুরপাড়ে মাছ ধরছিল—নির্দোষ, নিষ্পাপ এক মুহূর্ত।
হঠাৎ সেই মুহূর্ত ভেঙে যায় নির্মমতায়।
অভিযোগ, ইসমাইল হাওলাদার শিশুটিকে বেধড়ক মারধর করেন। সন্তানের আর্তচিৎকার শুনে ছুটে আসেন মা ও খালারা। কিন্তু সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেরাই পড়ে যান নৃশংসতার মুখে।
ইসমাইল হাওলাদার, তার নাতি ইলিয়াস ও শফিকসহ কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তিন বোনের ওপর।
এলোপাতাড়ি মারধর… কুপিয়ে জখম…
রক্তে ভিজে যায় সেই উঠান—
যেখানে একদিন তারা বাবার কোলে বসে হাসত।
পরদিন বুধবার বিচার চাইতে গেলে আবারও নেমে আসে সেই একই অমানবিকতা।
প্রাণভয়ে তিন বোন ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলে অভিযুক্তরা তাদের চলাচলের পথ কাঁটার বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলে।
নিজের বাড়িতেই তারা হয়ে যায় বন্দি।
শুধু তাই নয়—পুকুরের ঘাটলাও উপড়ে ফেলা হয়।
যেন বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়টুকুও মুছে দিতে চাওয়া হয়।
পরে খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে। কিন্তু সেই ভয়, সেই আতঙ্ক—কেউ কি মুছে দিতে পারবে?
🗣️ অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে শেষ আকুতি:
আহত নুসাইবা ও কুলসুম কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
“আমাদের ভাইকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে জমি লিখে নিয়েছে চাচা। এখন আমাদেরও উচ্ছেদ করতে চায়। আমরা কোথাও বিচার পাচ্ছি না… আমরা শুধু আমাদের পৈতৃক ভিটায় শান্তিতে থাকতে চাই…”
এই কথাগুলো কোনো অভিযোগ নয়—
এ যেন বেঁচে থাকার শেষ মিনতি।
অভিযুক্ত ইসমাইল হাওলাদার দাবি করেন, জমিটি তার ছেলে কামালের নামে বৈধভাবে দলিল করা। তবে দীর্ঘ ২৫-৩০ বছর ধরে জমিটি তার দখলে থাকার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন।
এ ঘটনায় লালমোহন থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. অলিউল ইসলাম বলেন,“খবর পেয়ে পুলিশ পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টাও চলছে।”
একটি নীরব প্রশ্ন, সবার জন্য?
পৈতৃক ভিটা—যেখানে থাকার কথা ছিল ভালোবাসা, নিরাপত্তা আর আশ্রয়—সেই ভিটাই আজ তিন এতিম বোনের জন্য রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্র।
বাবার মৃত্যুর পর যে চাচার হাত ধরেই তাদের এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল,সেই হাতই আজ তাদের জীবন থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইছে শেষ আশ্রয়টুকু।
তাদের কান্না আজ শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়—
এটি এক নির্মম বাস্তবতা, এক সমাজের মুখোশ খুলে দেওয়া সত্য।
প্রশ্নটা থেকেই যায়—এই সমাজে এতিমদের জন্য কি সত্যিই কোনো নিরাপদ আশ্রয় আছে?
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬