ক্রীড়া প্রতিবেদক
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে না পারার কষ্ট এখনও বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ভেতরে রয়ে গেছে। সেই হতাশা পুরোপুরি মুছে যায়নি। তবে দল এখন ধীরে ধীরে সামনে তাকাতে শুরু করেছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে আসন্ন ওয়ানডে সিরিজকে তাই নতুন শুরুর মঞ্চ হিসেবেই দেখছেন বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচ ফিল সিমন্স। তার ভাষায়, ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পথে এটাই বাংলাদেশের যাত্রার শুরু।
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরদিন মিরপুরে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন সিমন্স। সেখানে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ না পাওয়া নিয়ে দল এখনও কতটা ভুগছে। প্রশ্নটি শুনে তিনি বিরক্ত হননি। বরং হালকা হাসি দিয়ে স্বীকার করেছেন, এই আঘাত এখনও ক্রিকেটারদের মনে রয়ে গেছে। কারণ বিশ্বকাপ মিস করা কোনো ছোট ঘটনা নয়। একটি দলের জন্য এটি যেমন কষ্টের, তেমনি খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগতভাবে মানসিক আঘাতেরও বিষয়।
সিমন্স বলেন, তিনি ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের অনুভূতি কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তার উপলব্ধি, এই ব্যর্থতা ছেলেদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি এটাও মনে করেন, দল এখন ধীরে ধীরে সেই অধ্যায় পেছনে ফেলতে শুরু করেছে। তার বিশ্বাস, সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ বা বিসিএল এই মানসিক অবস্থার পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
তার মতে, এই ছোট্ট টুর্নামেন্টটি দলকে আবার ৫০ ওভারের ক্রিকেটের ছন্দে ফিরতে সাহায্য করেছে। বিশ্বকাপ হতাশার পর খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো যেমন জরুরি ছিল, তেমনি ওয়ানডে ফরম্যাটে নিজেদের আবার মানিয়ে নেওয়াও ছিল প্রয়োজন। বিসিএল সেই জায়গাটিতে সহায়ক হয়েছে বলেই মনে করছেন কোচ।
বাংলাদেশ এখন সামনে তাকাতে চাইছে পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে। এই সিরিজটিকে শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটিকে দেখা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে। কারণ ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ সামনে রেখে এখন থেকেই দল গঠন, পরিকল্পনা, কম্বিনেশন এবং মানসিক প্রস্তুতির কাজ শুরু করতে হবে।
পাকিস্তান ১১ বছর পর বাংলাদেশে ওয়ানডে সিরিজ খেলতে এসেছে। সবশেষ ২০১৫ সালে এই দুই দল বাংলাদেশে ওয়ানডে সিরিজে মুখোমুখি হয়েছিল। সেই সিরিজে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ। ফলে অনেকের মনে স্বাভাবিকভাবেই পুরনো স্মৃতি ফিরে আসছে। তবে সিমন্স অতীতের সেই ফলাফলে ভর করে বর্তমানকে সহজভাবে দেখতে রাজি নন।
তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন, পাকিস্তান ক্রিকেটকে কখনও হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ দেশটি নিয়মিতই নতুন নতুন প্রতিভাবান ক্রিকেটার তৈরি করে। এবারের পাকিস্তান দলে নতুন মুখ বেশি থাকলেও সেটিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন না তিনি। তার মতে, অভিষেক না হওয়া মানেই কেউ অযোগ্য নয়। জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে হলে তাদের যথেষ্ট ক্রিকেট খেলেই আসতে হয়েছে। তাই প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ কোচের ধারণা, পাকিস্তানও নিশ্চয়ই অতীতের মতো আরেকটি হতাশাজনক সিরিজ চায় না। তারা এবার শক্তভাবে ফিরে আসতে চাইবে। ফলে সিরিজটি হবে কঠিন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং পরীক্ষার। আর সেই চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত থাকতেই হবে বাংলাদেশকে।
সিমন্স আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, এবারের সিরিজ আগের কিছু সিরিজের তুলনায় ভালো উইকেটে হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেটিও বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক দিক। কারণ দলকে এখন এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে কেবল ধীর বা স্পিন-সহায়ক উইকেটেই নয়, বরং ভালো ক্রিকেট উইকেটেও নিজেদের কার্যকর প্রমাণ করতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি জায়গা করে নেওয়া। স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে ছাড়া নির্ধারিত সময় পর্যন্ত র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ আটটি দল সরাসরি মূল পর্বে খেলার সুযোগ পাবে। বর্তমানে বাংলাদেশ রয়েছে দশম স্থানে। অর্থাৎ সরাসরি যোগ্যতা অর্জন করতে হলে র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি করতেই হবে।
তবে এই মুহূর্তে র্যাঙ্কিংকে প্রধান চিন্তা হিসেবে দেখছেন না সিমন্স। তার মতে, আগে দলকে ভালো ওয়ানডে দল হিসেবে তৈরি হতে হবে। একসময় বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেটে বেশ শক্ত অবস্থানে ছিল। কিন্তু এখন সেই ধারাবাহিকতা আর আগের মতো নেই। অভিজ্ঞ কিছু ক্রিকেটার দলে নেই, বদলে গেছে অনেক কিছু। তাই এখন মূল কাজ হলো দলকে আবার প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা।
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে প্রতিভার অভাব নেই। দরকার সেই প্রতিভাকে নিয়মিতভাবে কাজে লাগানো। দল যদি নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারে, তাহলে র্যাঙ্কিংয়েও উন্নতি আসবে। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের সময়ে যত ওপরে থাকা যাবে, ততই ভালো হবে বাংলাদেশের জন্য।
ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক স্মৃতি অবশ্য খুব খারাপ নয়। সবশেষ সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল দল। কিন্তু সেই সিরিজের উইকেট, দল গঠন এবং কন্ডিশন ছিল ভিন্ন। মিরপুরের ধীর ও নিচু বাউন্সের উইকেটে সেখানে স্পিন-নির্ভর কৌশলই বেশি কার্যকর ছিল। এক ম্যাচে দুই পেসার খেলালেও পরের দুই ম্যাচে সেই চিত্র বদলে যায়। এমনকি এক পর্যায়ে একমাত্র পেসারকেও খুব বেশি বল করতে হয়নি।
কিন্তু সামনে যে বিশ্বকাপ, সেটি হবে দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ের মাটিতে। সেখানে পেস বোলারদের ভূমিকা হবে অনেক বেশি। সে কারণেই এখন থেকেই দলকে নতুনভাবে সাজাতে চান কোচ। তার ভাষায়, সামনে যতটা সম্ভব তিন পেসার নিয়ে খেলার চেষ্টা করবে বাংলাদেশ।
এটি কেবল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভবিষ্যৎ ভাবনারও অংশ। দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে সাফল্য পেতে হলে দ্রুতগতির বোলারদের নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনা থাকা জরুরি। তাই এখন থেকেই সেই বাস্তবতার সঙ্গে দলকে মানিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অবশ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী কখনও তিন স্পিনার নিয়েও নামতে হতে পারে। কিন্তু সেটি হবে বিশেষ চাহিদার ভিত্তিতে, নিয়মিত পরিকল্পনা হিসেবে নয়।
সিমন্সের কথায় পরিষ্কার, বাংলাদেশ এখন আর শুধু একটি সিরিজ জয়ের কথা ভাবছে না। তারা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে একটি শক্ত, ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক ওয়ানডে দল গড়ে তুলতে চায়। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ তাই শুধু মাঠের লড়াই নয়, এটি আগামী বিশ্বকাপকে সামনে রেখে মানসিক, কৌশলগত ও কাঠামোগত প্রস্তুতিরও সূচনা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলতে পারার হতাশা এখনও বাংলাদেশ দলের মনে দাগ কেটে আছে। তবে সেই কষ্ট নিয়েই দল এখন নতুন যাত্রায় নামছে। অতীতের ব্যর্থতা ভুলে, ভবিষ্যতের লক্ষ্য সামনে রেখে, পাকিস্তান সিরিজ দিয়েই শুরু হচ্ছে বাংলাদেশের ওয়ানডে বিশ্বকাপ অভিযানের প্রথম অধ্যায়।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ অনুষ্ঠিত হবে বুধবার, শুক্রবার ও রোববার।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬