বিশেষ প্রতিনিধি
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক হামলা সরাসরি বাংলাদেশের সীমান্তে না পৌঁছালেও এর অর্থনৈতিক অভিঘাত ইতোমধ্যে অনুভূত হতে শুরু করেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পণ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব দেশের জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্যপণ্যের দাম, রপ্তানি বাণিজ্য এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য। সেখানে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ইতোমধ্যে ব্যারেলপ্রতি ৮৩ ডলার ছাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে তা শিগগিরই ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে এর চেইন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কৃষি উৎপাদনে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক। এর একটি বড় অংশ আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি। কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এই গ্যাস আসে। কিন্তু ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে। এই রুট দিয়েই বিশ্বের বড় অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশেও গ্যাস ও জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, জ্বালানি মূল্য বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে শিল্পকারখানা, পরিবহন ও কৃষি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে বাজারে চাল, ডাল, সবজি এবং অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের জ্বালানি মজুদ সীমিত। ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানির মজুদ দুই থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ। নতুন করে আমদানি ব্যাহত হলে দ্রুত সংকট তৈরি হতে পারে। তাই বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং কৌশলগত মজুদ বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে। লোহিত সাগর বা সুয়েজ খালের মতো সমুদ্রপথ ঝুঁকিপূর্ণ হলে জাহাজ কোম্পানিগুলো বাড়তি যুদ্ধ ঝুঁকি চার্জ আরোপ করে। এতে পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। নিরাপদ রুটে পণ্য পাঠাতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হওয়ায় রপ্তানির সময়ও বাড়ে।
গার্মেন্টস খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, জ্বালানি ব্যয় ও পরিবহন খরচ বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক দেশের ক্রেতারা ইতোমধ্যে অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছে বলেও ব্যবসায়ীরা জানান।
অন্যদিকে কৃষি খাতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় সারের বড় অংশ আমদানি করে কাতার ও সৌদি আরব থেকে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ চেইন ব্যাহত হলে সময়মতো সার আমদানি করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন কমে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশের বড় অংশের শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে ওইসব দেশে নতুন কর্মী নিয়োগ কমে যেতে পারে। এমনকি কর্মসংস্থান সংকট তৈরি হলে অনেক প্রবাসীকেও দেশে ফিরতে হতে পারে।
যদিও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। তবে দীর্ঘমেয়াদে শ্রমবাজার সংকুচিত হলে প্রবাসী আয়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্থনীতিবিদরা সরকারকে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা, আমদানি উৎস বহুমুখীকরণ, কৌশলগত জ্বালানি মজুদ বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর মতো পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
বিশ্বের প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ সরাসরি বাংলাদেশের মাটিতে না এলেও এর অর্থনৈতিক ঢেউ ইতোমধ্যেই দেশের বাজার ও নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সেই প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলেই সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬