রংপুর প্রতিনিধি
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ঐতিহ্যবাহী যমুনেশ্বরী নদী এখন আর আগের মতো নেই। এক সময়ের প্রমত্ত এই নদী শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হচ্ছে বিস্তীর্ণ চরে। পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নদীর তলদেশ দখলে নিয়ে সেখানে ইরি-বোরো ধান, গম ভুট্টা, সরিসা,আখ,ডালসহ ইত্যাদি বীজতলা এবং বিভিন্ন রবিশস্যের চাষাবাদ শুরু করছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। ফলে অনেক স্থানে দেখে বোঝার উপায় নেই এটি একসময় নদীর অংশ ছিল। সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের মাধাই খামার, কুতুবপুর ইউনিয়ন, কালুপাড়া ইউনিয়ন, মধুপুর ইউনিয়ন, রাধানগর ইউনিয়ন ও দামোদরপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় নদীর দু’পাশে বিশাল চর জেগে উঠেছে। কোথাও নতুন করে বীজতলা তৈরি করা হয়েছে, কোথাও আবার আগেই রোপণ করা হয়েছে ইরি-বোরো ধান সহ নানা ফসল। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে গম, ভুট্টা, আলু, সরিষাসহ নানা রবিশস্যের আবাদ চলছে। স্থানীয়রা বলেন যখন যে সরকার আসে তখন সেই সরকারের দলীয় লোকজনেরা নদীতে সারা বছর চালায় বালু লুটপাট। শুষ্ক মৌসুম শুরু হলেই নদী দখলের এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পেশি শক্তির ব্যবহারও লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে নদীর তলদেশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। অনেকে নদীর জমিকে পৈতৃক সম্পত্তি দাবি করে চাষাবাদ করছেন। এমনকি চাষের সুবিধার্থে কোথাও কোথাও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তনের অভিযোগও উঠেছে।
সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, লোহানীপাড়া ইউনিয়নের উত্তর মাদাই খামার,দক্ষিণ মাদাই খামার, কচুয়া, সাহেবগঞ্জ, তেলিপাড়া, কুতুবপুর ইউনিয়নের নাগেরহাট ব্রিজ, কাচারিপাড়া, দালাল পাড়া, সোডা পীর, অরুণাছা ঘাট, চান্দামারীর ঘাট, দামোদপুর, গোপালপুর, রাধানগর, কালুপাড়া, গোপীনাথপুরসহ নদীর চরে জাগ্রত জমি প্রকৃত ভূমিহীনদের না দিয়ে লাঠিয়াল বেশি শক্তির বলয় যাদের আছে তারাই পেয়েছে নদীর চরে জাগ্রত ভূমিহীনদের জমি। শুধু তাতেই থেমে নয় সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যাদেরকে দেয়া হয়েছে ভূমিহীনদের জমি তারা আবার অন্য আরেকজনের কাছে সেই ভূমিহীন জমি বিক্রি করেছে। নিয়ম অনুযায়ী যদি সেই জমি বিক্রি করে তাহলে আবারও সরকারি দপ্তরে চলে যাওয়ার কথা কিন্তু সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে তার উল্টো চিত্র। কোথাও যেন আইনের বলয় নেই।
গাছুয়াপাড়া এলাকার মনজুরুল ইসলাম ও মোস্তাফিজার রহমান বলেন, “আমরা হতদরিদ্র মানুষ। নদীতে চাষ করতে চাইলে আমাদের সুযোগ দেওয়া হয় না। যাদের প্রভাব আছে, তারাই নদীর চরে চাষ করেন। পানি শুকালেই তারা নেমে পড়েন।লোহানীপাড়া ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য আইয়ুব আলী জান্টু বলেন,নদীর চরে যে সকল জমি পানি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে বের হয়েছে তা থেকে চলে বালু লুটতারাজ এবং যাদের বেশি শক্তি লোকজন বেশি তারাই চাষাবাদ করছে সেসব জমি। অন্যদিকে কুতুবপুর ইউনিয়নের কৃষক বাবু সিংহ বলেন, নদীর চরে চাষ করলে বাড়তি কিছু ফসল পাওয়া যায়। এতে সংসারে স্বস্তি আসে।তবে নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের দাবি, এভাবে অনিয়ন্ত্রিত চাষাবাদের কারণে নদীর গতিপথ বদলে যাচ্ছে এবং বন্যায় ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে।
কুতুবপুর ইউনিয়নের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা শাহজালাল বলেন, নদীতে ভাঙনের ফলে যে জমি সৃষ্টি হয়, তা খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়। নিয়ম অনুযায়ী চর জেগে উঠলে তা জরিপ করে ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত করে ভূমিহীনদের মধ্যে বন্দোবস্ত দেওয়ার বিধান রয়েছে। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি সেই জমির দাবিদার হতে পারেন না। তিনি আরও বলেন, “নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করে কোনোভাবেই চাষাবাদ করা যাবে না। বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেলিনা আফরোজ জানান, চরাঞ্চলে কত হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান কৃষি অফিসের কাছে নেই। এসব জমিতে মৌসুমভেদে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদিত হয়। এদিকে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নদীর তলদেশে কত একর জমি বর্তমানে চাষযোগ্য তারও কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই।
স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি জানান, কয়েক দশক ধরে নানা সংকটের কারণে শুষ্ক মৌসুমে দ্রুত পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। ড্রেজিং বা নিয়মিত সংস্কারের অভাবে নদী ক্রমেই ভরাট হচ্ছে। প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি না থাকায় দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তলদেশে অনিয়ন্ত্রিত চাষাবাদ ও পানি প্রবাহে হস্তক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এতে নদীর প্রাকৃতিক গতিপথ বদলে গিয়ে বর্ষা মৌসুমে হঠাৎ প্লাবন বা ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে। নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা অবিলম্বে নদী দখলমুক্ত করা, জরিপ পরিচালনা এবং পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে এক সময়ের প্রমত্ত যমুনেশ্বরী নদী মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যেতে পারে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে নদী রক্ষা ও অবৈধ দখল বন্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবেই টিকে থাকবে যমুনেশ্বরীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬