আলী কদর পলাশ
বঙ্গভবনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে এক “অস্বস্তির রাষ্ট্রকাহিনি”। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তিনি কার্যত “সম্পূর্ণ অন্ধকারে” ছিলেন। বিদেশ সফর, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, এমনকি তাঁর নাম-ছবি ‘দৃশ্যমান’ রাখার প্রথাগত ব্যবস্থাও নাকি একের পর এক ভেঙে দেওয়া হয়।
এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়। এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো, রাষ্ট্রপতির প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা, আর অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতার সীমারেখা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে এটিকে দেখা হচ্ছে “ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায় ছিল”– সেই বিতর্কের সবচেয়ে সরাসরি সাক্ষ্য হিসেবে।
কী বলেছেন রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতির মূল অভিযোগ তিনটি স্তরে ছড়ানো।
এক. সাংবিধানিক যোগাযোগ ভেঙে পড়া। রাষ্ট্রপতির ভাষ্য, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিদেশ সফর শেষে লিখিতভাবে জানানোর যে বাধ্যবাধকতা আছে। তা মানা হয়নি। তিনি বলেছেন, একাধিকবার সফর হলেও তাঁকে একবারও জানানো হয়নি।
দুই. রাষ্ট্রপতির কূটনৈতিক ভূমিকা ‘কাটছাঁট’। কসোভো ও কাতারের আমন্ত্রণে যাওয়ার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়। এমনকি তাঁর পক্ষ থেকে “ব্যস্ততার” অজুহাতে চিঠি তৈরি হলেও তাঁর সঙ্গে আলোচনা হয়নি- এই অভিযোগও উঠেছে।
তিন. রাষ্ট্রপতিকে সরানোর চেষ্টা ও বঙ্গভবন ঘিরে চাপ। রাষ্ট্রপতি বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে তাঁকে অপসারণে একাধিক প্রচেষ্টা হয়েছে। তিনি ২০২৪ সালের অক্টোবরের এক রাতকে “ভীতিকর” বলেও উল্লেখ করেন এবং বলেন, শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সামরিক মোতায়েন লাগে।
এই সাক্ষাৎকার কেন চাঞ্চল্যকর
এটি একটি বিরল ঘটনা। রাষ্ট্রপতি নিজেই আগেও বলেছিলেন, ইউনূস সরকারের সময়ে তিনি অপমানিত, প্রান্তিক এবং তাঁর ‘ভয়েস’ চাপা পড়েছিল। ওই বক্তব্য তখন রয়টার্সের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংবাদধারায় যায়। এবার কালের কণ্ঠকে দেওয়া বিস্তৃত ভাষ্যে সেই অভিযোগ আরও খোলামেলা, আরও ধারালো। ফলে ঘটনাটি দেশীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে “রাষ্ট্র বনাম সরকার”। এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক টানাপোড়েনের গল্প হয়ে উঠেছে।
আরেকটি বড় কারণ সময়। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এবং রাষ্ট্রপতি সাম্প্রতিক সময়েই নতুন প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পড়িয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যকে অনেকে দেখছেন “পোস্ট-ইন্টারিম রেকর্ডে সত্য-দলিল” হিসেবে।
দেশি গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়ার ধারা
দেশের সংবাদধারায় আলোচনার কেন্দ্রে তিনটি প্রশ্ন ঘুরছে।
সাংবিধানিক প্রটোকল কতটা ভাঙা হলো? রাষ্ট্রপতির অভিযোগ সত্য হলে, রাষ্ট্রের শীর্ষ সাংবিধানিক পদকে পাশ কাটিয়ে নীতিনির্ধারণের একটি ‘নতুন রীতি’ দাঁড়িয়েছিল কি না এটাই বড় প্রশ্ন।
অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা বনাম শিষ্টাচার: অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা বাস্তবে কতটা বিস্তৃত ছিল, আর রাষ্ট্রপতির “প্রধানত আনুষ্ঠানিক” ভূমিকার সীমা কোথায়, এই রেখা আরও ঘোলাটে হয়েছে।
বঙ্গভবন ঘিরে নিরাপত্তা-রাজনীতি: অপসারণ চক্রান্ত ও “ভিড়/মব” প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান নিয়েও আলোচনা তীব্র হয়েছে।
বিদেশি গণমাধ্যমে কেন এটি বড় খবর
আন্তর্জাতিক সংবাদপাঠকের কাছে বাংলাদেশ সাধারণত দেখা হয় সরকার পরিবর্তন, নির্বাচন, মানবাধিকার ও ভূরাজনীতির চশমায়। রাষ্ট্রপতির এই সাক্ষাৎকারে সেই ফ্রেমে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। “ইন্টারিম রুল বনাম কনস্টিটিউশনাল নর্মস”। ভারতের প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্মগুলো শিরোনাম করেছে রাষ্ট্রপতিকে “অন্ধকারে রাখা”, “প্রেস উইং কেড়ে নেওয়া”, “দূতাবাস থেকে ছবি সরানো” এসবকে প্রাতিষ্ঠানিক ‘সাইডলাইনিং’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
বিশেষ করে বিদেশি পাঠকের কাছে “রাষ্ট্রপতির ছবি দূতাবাস থেকে এক রাতে সরানো” এটি প্রতীকী রাজনীতির বড় ইঙ্গিত। কারণ কূটনৈতিক মিশনে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিকৃতি শুধু ছবি নয়, রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতার চিহ্ন হিসেবেও দেখা হয়।
আর্মড ফোর্সেস ও বিএনপি প্রসঙ্গের তাৎপর্য
রাষ্ট্রপতি বলেছেন, সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব এবং বিএনপি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক ছিল। এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। কারণ এতে ইঙ্গিত যায়- সে সময় রাষ্ট্রপতির টিকে থাকা কেবল তাঁর সাংবিধানিক অবস্থানের কারণে নয়, শক্তিশালী রাজনৈতিক-প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের কারণেও।
এটা একদিকে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তাবোধ বাড়ায়। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় “কার সমর্থন রাষ্ট্রকে স্থিত রাখে” এই প্রশ্নও সামনে আনে।
সামনে কী প্রভাব পড়তে পারে
১) ইন্টারিম শাসনের নিয়ম-কানুন লিখিত করার চাপ বাড়তে পারে। ভবিষ্যতে অন্তর্বর্তী সরকার এলে রাষ্ট্রপতি-প্রধান উপদেষ্টার যোগাযোগ, কূটনৈতিক অনুমোদন, রাষ্ট্রীয় চিঠিপত্র এসবের স্পষ্ট গাইডলাইন তৈরির দাবি উঠবে।
২) রাষ্ট্রপতির পদ ‘আনুষ্ঠানিক’ হলেও প্রতীকী ক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে বিতর্ক জোরালো হবে। কারণ রাষ্ট্রপতির দৃশ্যমানতাকে মুছে দেওয়ার অভিযোগ সরাসরি প্রতীকি ক্ষমতার লড়াইকে সামনে আনে।
৩) কূটনীতিতে “কে কথা বলেছিল”– এই প্রশ্নে পুরনো সিদ্ধান্তগুলো পুনরায় খতিয়ে দেখার চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বিদেশ সফর ও চুক্তির তথ্য রাষ্ট্রপতির কাছে না যাওয়ার অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে।
উপসংহার
রাষ্ট্রপতির এই সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় দলিল। এখানে ব্যক্তিগত অপমানের কথা আছে। আছে সাংবিধানিক শিষ্টাচারের ভাঙনের অভিযোগ। আছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র বদলের ইঙ্গিত।
সবচেয়ে বড় কথা, এই বক্তব্য এখন আর শুধু ঘরোয়া রাজনীতির খবরে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বিদেশি সংবাদমাধ্যমেও বাংলাদেশকে দেখার ভাষা বদলে দিচ্ছে—রাষ্ট্রের নিয়ম ঠিক ছিল কি না, আর রাষ্ট্রপতি কতটা রাষ্ট্র ছিলেন- এই প্রশ্নগুলোকে সামনে এনে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬